খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হলো জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬। ‘রূপালি মৎস্য, সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে গত রোববার ১৬ আগস্ট সকালে উপজেলা মৎস্য দপ্তরের উদ্যোগে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। এর মধ্যে ছিল বর্ণাঢ্য র্যালি, মাছের পোনা অবমুক্তকরণ এবং মৎস্য চাষিদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা সভা। পাহাড়ি এই জনপদে মাছ চাষের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও নানা সমস্যার কারণে মৎস্যজীবীরা পিছিয়ে আছেন বলে সভায় উঠে আসে।
সকাল ১০টায় দীঘিনালা উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে কয়েকশ মৎস্যচাষি ও মৎস্যজীবী উপস্থিত ছিলেন। র্যালিতে মাছ চাষের আধুনিক পদ্ধতি ও দেশি মাছ রক্ষার নানা ব্যানার-ফেস্টুন প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরৎ কুমার ত্রিপুরা। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মৎস্য দপ্তরের স্থানীয় প্রতিনিধিরা।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাৎ হোসেন, দীঘিনালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল বাহার চৌধুরী এবং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. জয়নাল আবেদীন। বক্তারা পাহাড়ি এলাকায় মাছের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেন এবং কৃষকদের নতুন নতুন পদ্ধতি শেখার আহ্বান জানান। তারা বলেন, দীঘিনালার আবহাওয়া ও পানি মাছ চাষের জন্য ১০০% উপযোগী।
মৎস্যজীবীদের পক্ষ থেকে সভায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরা হয়। বর্তমানে মৎস্যজীবীদের প্রতি ২ মাসে মাত্র ২০ কেজি করে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়, যা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে খুবই সামান্য। এই সহায়তা অন্তত ১৫০% বাড়িয়ে ৫০ কেজি করার দাবি জানান স্থানীয় মৎস্যজীবীরা। তারা বলেন, ২০ কেজি চালে একটি সাধারণ পরিবারের ১৫ দিনও চলে না। যদি সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি করা হয়, তবে জেলেরা নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে পারবেন এবং এতে দেশে মাছের উৎপাদন প্রায় ৩০% থেকে ৪০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
সভায় মৎস্য কার্ড বিতরণে বিগত দিনের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, অতীতে অনেক জায়গায় প্রকৃত মৎস্যজীবীরা কার্ড পাননি, বরং প্রভাবশালীরা সেই সুবিধা ভোগ করেছেন। এবার মৎস্য কার্ড বিতরণে ১০০% স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। সরকার যদি মৎস্য খাতে ঋণ সহায়তায় সুদের হার ৫% এর নিচে নামিয়ে আনে, তবে শিক্ষিত বেকার যুবকরাও মাছ চাষে আগ্রহী হবে বলে মৎস্যচাষিরা অভিমত দেন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের অভাবকেও মাছ উৎপাদনের একটি বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ বলেন, দীঘিনালার প্রতিটি জলাশয়কে মাছ চাষের আওতায় আনতে হবে। তিনি আশ্বাস দেন যে, সরকারি সকল সুবিধা যেন প্রকৃত মৎস্যজীবীরা পান, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কঠোর মনিটরিং করবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করলে খরচ ১০% কমিয়ে লাভ ২০% বাড়ানো সম্ভব। তিনি মৎস্য দপ্তরকে নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে গিয়ে চাষিদের পরামর্শ দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মাছের খাদ্য ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়েও তিনি কথা বলেন।
আলোচনা সভা শেষ করে উপজেলা পরিষদের পাশের পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। রুই, কাতলা ও মৃগেলসহ কার্প জাতীয় মাছের কয়েক হাজার পোনা অবমুক্ত করে এই দিবসের মূল কার্যক্রম শেষ হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত মৎস্যচাষিরা জানান, তারা যদি নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং উন্নত মানের মৎস্য খাদ্য সুলভ মূল্যে পান, তবে দীঘিনালা থেকে মাছের চাহিদা পূরণ করে অন্য জেলাতেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তারা মাছ সংরক্ষণের জন্য একটি কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার স্থাপনেরও দাবি জানান।
পরিশেষে বলা যায়, মৎস্য সম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি। দীঘিনালার মতো পাহাড়ি অঞ্চলে মাছ চাষের আধুনিকায়ন করতে পারলে স্থানীয় মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও আসবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন মৎস্যজীবীদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া এবং দুর্নীতির জঞ্জাল পরিষ্কার করা। সরকারের সঠিক নজরদারি আর চাষিদের কঠোর পরিশ্রমই পারে দীঘিনালাকে মাছের খনি হিসেবে গড়ে তুলতে। মৎস্য পক্ষ পালনের মাধ্যমে এই বার্তাটিই সবার মাঝে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
















