শৈলকুপায় উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভা: মাদক ও কিশোর অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এক গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত রোববার (১৬ আগস্ট) সকালে উপজেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে এই সভাটি আয়োজিত হয়। উপজেলার বর্তমান পরিস্থিতি এবং আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করাই ছিল এই সভার মূল লক্ষ্য। সভার শুরুতে এলাকার সাম্প্রতিক কিছু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং তা দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। শৈলকুপার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

সভায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ এবং কিশোর অপরাধ দমনের বিষয়টি। বর্তমান সময়ে শৈলকুপার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, গত মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায় ৮০% লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়েছে। তবে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে শুধু গ্রেফতার নয়, বরং পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার বন্ধে পুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য পায়। ইদানীং বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এখন থেকে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হবে এবং দোকানের সামনে মূল্যের তালিকা টাঙানো বাধ্যতামূলক। কোনো বিক্রেতা যদি পাইকারি দামের চেয়ে ১০% থেকে ১৫% এর বেশি মুনাফায় পণ্য বিক্রি করে, তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে মোটা অংকের জরিমানা করা হবে। এই কড়াকড়ির ফলে সাধারণ ক্রেতাদের বাজার খরচ মাসে অন্তত ৫০০০ টাকা থেকে ৬০০০ টাকা (বা প্রায় ৫০থেকে৬০ডলারের মতো) সাশ্রয় হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

সভায় উপস্থিত জনপ্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ এলাকার রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা এবং রাতে চুরির ঘটনা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশ্বাস দেন যে, পুলিশের টহল আগের চেয়ে দ্বিগুণ করা হবে। বিশেষ করে রাত ১১টার পর অকারণে মোড়ে মোড়ে আড্ডা দেওয়া বা উচ্চস্বরে বাইক চালানো নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়। অপরাধ প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের সচেতনতা যে ১০০% জরুরি, সেই বিষয়ে বক্তারা একমত পোষণ করেন। প্রতিটি ইউনিয়নে বিট পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ও জনবল নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এই সভায়।

নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং বাল্যবিবাহ রোধ করার জন্য সভায় বিশেষ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। ইভটিজিং বা সাইবার বুলিং প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে সিভিল পোশাকে পুলিশ মোতায়েনের কথা ভাবছে প্রশাসন। এছাড়া জমিজমা সংক্রান্ত তুচ্ছ বিরোধ মেটাতে গ্রাম আদালতের কার্যক্রমকে আরও সক্রিয় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের মতে, ছোটখাটো বিবাদ যদি গ্রামেই সঠিকভাবে মীমাংসা করা যায়, তবে থানায় মামলার জট অন্তত ৫০% কমে আসবে। এতে সাধারণ মানুষের হয়রানি যেমন কমবে, তেমনি হাজার হাজার টাকা সাশ্রয় হবে। এই সমন্বয়হীনতা দূর করতে সরকারি প্রতিটি দপ্তরকে আরও স্বচ্ছতার সাথে কাজ করতে বলা হয়েছে।

সভার শেষ পর্যায়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, প্রশাসন, পুলিশ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সঠিক যোগাযোগ না থাকলে কোনো অভিযানই সফল হবে না। শৈলকুপাকে একটি মডেল এবং নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সবাইকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। সভায় জানানো হয়, প্রতি মাসে এমন সভার মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। অপরাধ দমনে কোনো ধরণের রাজনৈতিক সুপারিশ আমলে না নেওয়ার জন্যও প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

শৈলকুপার সাধারণ মানুষ প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে, নিয়মিত এমন আলোচনার ফলে অপরাধীরা চাপে থাকবে এবং জনমনে স্বস্তি ফিরবে। উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এই সভায় সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। সবাই একযোগে শৈলকুপাকে অপরাধমুক্ত করার শপথ নেওয়ার মাধ্যমে সভার সমাপ্তি ঘটে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সভার এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হতে শুরু করবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ