৫০ হাজার টাকা যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা: ১ বছর পর ঘাতক স্বামী ইসমাইল র‍্যাবের খাঁচায়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

আমাদের সমাজে যৌতুক একটি অভিশপ্ত ব্যাধি হিসেবে গেড়ে বসেছে। এই লোভের বলি হয়ে প্রতি বছর শত শত নারী প্রাণ হারান। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় মাত্র ৫০,০০০ টাকা বা একটি কোরবানির ছাগলের জন্য সুমি আক্তার (২১) নামের এক গৃহবধূকে জীবন দিতে হয়েছে। গত বছরের জুনে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি মো. ইসমাইল হোসেন (২৫) দীর্ঘ ১৪ মাস পালিয়ে থাকার পর অবশেষে ধরা পড়েছে। র‍্যাব-১১ এবং র‍্যাব-৭ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সুমির পরিবার এবং এলাকাবাসীর মধ্যে এক ধরণের স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে।

গ্রেপ্তারকৃত পাষণ্ড স্বামী ইসমাইল হোসেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার রাজগঞ্জ ইউনিয়নের দিলিলপুর গ্রামের এনামুল হক বাবুলের ছেলে। গত শনিবার (১৫ আগস্ট) রাত পৌনে ৮টার দিকে চট্টগ্রামের আকবরশাহ থানাধীন ফৌজদারহাট এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। র‍্যাব জানায়, সুমিকে হত্যার পর ইসমাইল এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়। সে নিজের পরিচয় গোপন করে এতদিন চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে কাজ করছিল। তবে র‍্যাবের গোয়েন্দা দল তার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয় এবং শতভাগ (১০০%) নিখুঁত পরিকল্পনায় তাকে গ্রেপ্তার করে।

হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অত্যন্ত তুচ্ছ কারণে ইসমাইল তার স্ত্রীকে নির্যাতন করত। র‍্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কোরবানি ঈদের আগে ইসমাইল তার শ্বশুরবাড়ির কাছে একটি ছাগল এবং একটি স্টিলের আলমারি দাবি করে। যদি এগুলো দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে নগদ ৫০,০০০ টাকা (যা বর্তমান বৈশ্বিক মুদ্রায় প্রায় ৪২৫$ ডলারের সমান) দাবি করে সে। সুমির বাবা পেশায় একজন সাধারণ মানুষ হওয়ায় মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে কিছু টাকা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই টাকা ইসমাইলের দাবিকৃত ৫০,০০০ টাকার চেয়ে অনেক কম ছিল। এই বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে চরম অশান্তি শুরু হয়।

গত বছরের ৬ জুন রাতে টাকার অংক কম হওয়া নিয়ে ইসমাইল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ আছে, ওই রাতে সে সুমি আক্তারকে পশুর মতো এলোপাতাড়ি মারধর করে। নির্যাতনের একপর্যায়ে সুমি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে তড়িঘড়ি করে নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সুমিকে মৃত ঘোষণা করেন। স্ত্রীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই ইসমাইল হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়। এরপর আদালত সরাসরি এই ঘটনায় মামলা গ্রহণের নির্দেশ দিলে বেগমগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

র‍্যাব-১১, সিপিসি-৩ নোয়াখালীর কোম্পানি কমান্ডার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মিঠুন কুমার কুণ্ডু বলেন, “আমরা এই মামলার ছায়া তদন্ত শুরু করি। অপরাধী যত চালাকই হোক না কেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা তাকে শনাক্ত করি। ইসমাইল ভেবেছিল ১ বছর পার হয়ে গেলে হয়তো পুলিশ তাকে আর খুঁজবে না। কিন্তু আমরা এই আসামীকে গ্রেপ্তারে আমাদের শক্তির ১০০% প্রয়োগ করেছি।” তিনি আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইসমাইল তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। রোববার সকালে তাকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে চট্টগ্রামের আকবরশাহ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে, যেখান থেকে তাকে নোয়াখালী আদালতে পাঠানো হবে।

বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ১০% থেকে ১৫% গৃহবধূ শুধুমাত্র যৌতুকের কারণে শারীরিক সহিংসতার শিকার হন। সুমি আক্তারের মৃত্যু সেই নির্মম বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। তার পরিবার জানায়, তারা অভাবের মাঝেও মেয়ের বিয়েতে সাধ্যমতো খরচ করেছিলেন। কিন্তু ইসমাইলের টাকার নেশা শেষ পর্যন্ত একটি সুন্দর সংসার ধ্বংস করে দিল। সুমির মা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার মেয়েকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু এই খুনি ইসমাইলের যেন ফাঁসি হয়। আমরা দ্রুততম সময়ে এই বিচারের রায় দেখতে চাই।”

বর্তমানে ইসমাইলকে কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ এলাকার সাধারণ মানুষ এই গ্রেপ্তারের সংবাদে আনন্দিত। তারা মনে করেন, যদি এই ধরণের অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি দেওয়া হয়, তবে সমাজে অপরাধের মাত্রা অনেক কমে আসবে। ৫০,০০০ টাকা বা একটি স্টিলের আলমারির জন্য একজন মানুষের প্রাণ নেওয়া কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ হতে পারে না। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হলে ভবিষ্যতে আর কোনো যৌতুকলোভী স্বামী তার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার সাহস পাবে না। র‍্যাবের এই সফল অভিযানকে সচেতন নাগরিক সমাজ সাধুবাদ জানিয়েছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ