সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে আজ এক নজিরবিহীন ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার বিকেলে রায়গঞ্জ-তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ-৩) আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মো. আয়নুল হকের গাড়িবহরে অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার ধানগড়া বাজারে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশ নিয়ে ফেরার পথে এই হামলার শিকার হন তিনি। দুর্বৃত্তদের ছোড়া ইটের আঘাতে এমপির ব্যক্তিগত গাড়ির পেছনের কাঁচ পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে রায়গঞ্জ ও চন্দাইকোনা এলাকায় কয়েকশ বিএনপি নেতা-কর্মী রাজপথে নেমে আসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় ১০০% অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় মূলত একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) নির্মাণের জায়গা নির্ধারণ নিয়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে ৪:৩০ মিনিটের দিকে ধানগড়া বাজারে এই টিটিসি নির্মাণের স্থান চূড়ান্ত করতে একটি সাধারণ সভা আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এমপি আয়নুল হক। সভা শেষে সন্ধ্যা ৬:০০টার দিকে তিনি যখন নিজের গাড়িতে চড়ে ফিরছিলেন, তখন ধানগড়া বাজারের কিছু স্থানীয় বাসিন্দা তার পথ আগলে ধরেন। তারা দাবি করেন, টিটিসি ভবনটি যেন অবশ্যই ধানগড়া এলাকায় নির্মাণ করা হয়। এই নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে হঠাৎ করে পেছন থেকে ইটের বৃষ্টি শুরু হয়। একটি বড় ইটের আঘাতে এমপির গাড়ির পেছনের বিশাল কাঁচটি ভেঙে যায়। এতে গাড়ির ভেতরে থাকা এমপি ও তার সফরসঙ্গীরা বড় ধরনের বিপদ থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পান।
এই হামলার জন্য সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপি সরাসরি জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি (ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি) নামক একটি স্থানীয় সংগঠনকে দায়ী করেছে। এমপির সফরসঙ্গী ফয়সাল আহমেদ হামলার পরপরই তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে দাবি করেছেন যে, জামায়াত-শিবির ও এনসিপির কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে এই আক্রমণ চালিয়েছে। এই পোস্টের পর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। বিক্ষুব্ধ বিএনপি কর্মীরা দাবি করছেন, এমপির ওপর এই হামলা মানে পুরো সিরাজগঞ্জবাসীর ওপর হামলা। গাড়ির কাঁচ ভাঙার ফলে প্রায় ৩৫,০০০ টাকা (যা প্রায় ৩০০ ডলার বা $ এর সমান) মূল্যের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে সংসদ সদস্যের গাড়িতে হামলার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে উপজেলা জামায়াতে ইসলামী। সংগঠনের রায়গঞ্জ উপজেলা আমির আলী মর্তুজা বলেন, যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেই জামায়াতের ওপর দোষ চাপানো বিএনপির দীর্ঘদিনের পুরোনো অভ্যাস। তিনি দাবি করেন, এই ঘটনার সাথে তাদের দলের কোনো সদস্যের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই এবং তারা একটি আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করবেন। স্থানীয় সাধারণ মানুষ মনে করছেন, টিটিসি ভবনের জায়গা নিয়ে জনগণের ক্ষোভকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। বর্তমানে ধানগড়া এলাকায় প্রায় ৭০% থেকে ৮০% মানুষের মধ্যে এই টিটিসি ভবন নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।
ঘটনার পরপরই রায়গঞ্জের চন্দাইকোনা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিএনপির কয়েকশ নেতা-কর্মী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। তারা দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সময়ে ধানগড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় স্থানীয় সাধারণ মানুষও একটি পাল্টা মিছিল বের করেন। তাদের দাবি ছিল, যেকোনো মূল্যে টিটিসি ভবনটি ধানগড়া এলাকাতেই করতে হবে। একই সময়ে দুটি পৃথক মিছিল চলায় এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ পথচারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রায় ১০০% আতঙ্ক কাজ করছিল যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাত লেগে যেতে পারে। পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে উভয় পক্ষকে দূরে রাখার চেষ্টা করে।
সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপি সন্ধ্যায় এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলেছে, একজন সংসদ সদস্যের ওপর এমন হামলা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। এমপি আয়নুল হক নিজে এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি জনগণের সেবায় গিয়েছিলাম, অথচ সেখানে আমাকে কেন আক্রমণের শিকার হতে হলো তা বোধগম্য নয়।” এমপির সমর্থকরা বর্তমানে তার বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন এবং নিরাপত্তার জন্য সেখানে পুলিশের বিশেষ দল পাহারায় রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (রায়গঞ্জ সার্কেল) সাইফুল ইসলাম খান রাত ৯:০০ টার দিকে জানান, এমপির গাড়িতে যারা ঢিল ছুড়েছে তাদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ বর্তমানে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছে। পরিস্থিতি আপাতত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ধানগড়া বাজারে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। কোনো কুচক্রী মহল যেন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা লাগাতে না পারে, সেজন্য পুলিশ ১০০% সজাগ রয়েছে। এই হামলার ঘটনায় এখনো কোনো মামলা দায়ের হয়নি, তবে পুলিশ বাদী হয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
















