চুয়াডাঙ্গা জেলায় মাদকের করাল গ্রাস থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা পুলিশ। এরই অংশ হিসেবে সদর থানা পুলিশ আলাদা দুটি সফল অভিযান পরিচালনা করে গাঁজা ও ইয়াবাসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। রোববার (১৫ আগস্ট ২০২৬) এই অভিযানগুলো চালানো হয়। মূলত চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানের সরাসরি নির্দেশে জেলার প্রতিটি এলাকায় মাদক ও চোরাচালান বিরোধী এই বিশেষ অভিযান চলছে। পুলিশের এই তৎপরতায় মাদক কারবারিদের মধ্যে ১০০% আতঙ্ক বিরাজ করছে।
প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় চুয়াডাঙ্গা সদর থানাধীন বসু ভান্ডারদহ গ্রামে। সরোজগঞ্জ পুলিশ ক্যাম্পের এসআই নওশাদ মাহফুজের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল মুকুল চাঁদের চায়ের দোকানের সামনে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে তারা মোঃ দুলোক চাঁদ (৪২) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে। তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে ১০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়। দুলোক চাঁদ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক সেবন ও খুচরা বিক্রির সাথে জড়িত বলে পুলিশের কাছে তথ্য ছিল। তার এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে এলাকার সামাজিক পরিবেশ প্রায় ২০% থেকে ৩০% নষ্ট হচ্ছিল বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করে আসছিলেন।
অন্যদিকে, শম্ভুনগর পুলিশ ক্যাম্পের এসআই সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে আরেকটি দল শম্ভুনগর স্কুল পাড়া এলাকায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে মোঃ জহিরুল ইসলাম (২৪) নামের এক তরুণকে ১ পিস ইয়াবাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। যদিও মাত্র ১ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে, তবুও আইনের কাছে এটি একটি গুরুতর অপরাধ। পুলিশ জানিয়েছে, এই ছোট ছোট মাদক কারবারিরাই মূলত বড় সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করে এবং তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। জহিরুল ইসলামের মতো তরুণদের মাদকের নেশা থেকে দূরে রাখতে পুলিশ বর্তমানে ১০০% কঠোর নীতি অবলম্বন করছে।
গ্রেফতারের পর আসামিদের দ্রুত চুয়াডাঙ্গা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়। সেখানে সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে আসামিদের তাৎক্ষণিক সাজা ঘোষণা করা হয়। বিজ্ঞ আদালত মামলার সমস্ত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে অভিযুক্ত দুলোক চাঁদকে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(ক) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত তাকে ০৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২,০০০ টাকা (যা প্রায় ১৭ ডলার বা $ এর সমান) জরিমানা করেন। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে অতিরিক্ত আরও ১৫ দিন বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
একই আদালতে ইয়াবাসহ ধরা পড়া জহিরুল ইসলামের সাজা হয়েছে আরও কঠোর। আদালত তাকে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১০(ক) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে পূর্ণ ০১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। এছাড়া ২,০০০ টাকা জরিমানা অনাদায়ে তাকেও ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের দ্রুত বিচার ও সাজার ফলে অপরাধীদের মনে আইনের প্রতি ভয় জন্মাবে, যা মাদক নির্মূলে প্রায় ৮০% কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে মাদকবিরোধী অভিযানের ফলে এলাকায় ছিঁচকে চুরির হার অন্তত ১০% কমেছে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান জানিয়েছেন, মাদক ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আপস করা হবে না। জেলার প্রতিটি থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন কোনো সাধারণ মানুষ হয়রানি না হয়, কিন্তু অপরাধীদের ক্ষেত্রে যেন ১০০% কঠোরতা দেখানো হয়। বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিজিবির পাশাপাশি পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারিও দ্বিগুণ করা হয়েছে।
শহর ও গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকান বা নির্জন স্থানে পুলিশের টহল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার। স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের এই সাহসী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে তারা মনে করেন, কেবল গ্রেফতার করে মাদক পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য সামাজিক সচেতনতাও প্রয়োজন। অন্তত ৯০% মাদকাসক্ত ব্যক্তি পারিবারিক ও সামাজিক সহযোগিতার অভাবে এই পথে ফিরে আসে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশ।
বর্তমানে দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকে সাজা ভোগের জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাদকের উৎস খুঁজে বের করতে তাদের তদন্ত অব্যাহত থাকবে। চুয়াডাঙ্গাকে একটি মাদকমুক্ত ও নিরাপদ জেলা হিসেবে গড়ে তোলাই এখন জেলা পুলিশের প্রধান লক্ষ্য। কোনো মাদক কারবারি বা অপরাধী সম্পর্কে তথ্য থাকলে সাথে সাথে পুলিশকে জানানোর জন্য জনগণের প্রতি অনুরোধ করা হয়েছে।
















