ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একজন মানুষ, যার আসলে কোনো নির্দিষ্ট মুখপাত্রের প্রয়োজন হয় না। আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত এবং কোলাহলপ্রিয় এই প্রেসিডেন্ট প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কথা নিজেই বলে থাকেন। কখনো সাংবাদিকদের সাথে সরাসরি ঝগড়ায় জড়িয়ে, আবার কখনো বিতর্কিত সব পোস্ট দিয়ে তিনি সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে যান। তাই তার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটের পদত্যাগের খবরটি সাধারণ মানুষের কাছে মামুলি মনে হতে পারে। তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক শিবিরের ভেতরে খবর হলো, লেভিটের এই বিদায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় একটি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট অ্যান্ড্রুস বিমানঘাঁটিতে ট্রাম্পকে যখন দেখা যায়, তখন তার ছায়াসঙ্গী লেভিটকে নিয়ে বেশ গুঞ্জন ছিল। অবশেষে লেভিট নিজেই জানালেন তিনি আর এই পদে থাকছেন না। গত মে মাসে তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়েছে। লেভিট বলেছেন, সন্তানদের তিনি পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না, যা একজন কর্মজীবী মায়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প নিজেও তার এই বিশ্বস্ত সহযোগীর প্রশংসা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, লেভিট ভবিষ্যতে বাইরের একজন উপদেষ্টা হিসেবে তার সাথে কাজ করবেন। উল্লেখ্য যে, ট্রাম্পের প্রচারণার কাজে লেভিট প্রায় $১০০ মিলিয়ন ডলারের মিডিয়া প্ল্যানিংয়ের সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন, যা তাকে ট্রাম্পের আস্থার পাত্রী করে তুলেছিল।
ক্যারোলাইন লেভিট কোনো সাধারণ মুখপাত্র ছিলেন না। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালিয়েছেন। ট্রাম্প যেমন সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হতেন, লেভিটও তার পদের প্রথা ভেঙে সেই একই পথে হাঁটতেন। তিনি সাংবাদিকদের সরাসরি উত্তর না দিয়ে উল্টো তাদের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলতেন। ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের মধ্যে লেভিটের জনপ্রিয়তা ছিল প্রায় ১০০%। তাদের কাছে লেভিট ছিলেন এমন এক ‘হিরোইন’, যিনি কি না তথাকথিত মূলধারার গণমাধ্যমকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতেন। তার ব্রিফিংগুলো নীতি ব্যাখ্যার চেয়ে ট্রাম্পের অবাধ্যতার প্রদর্শন হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রেস সেক্রেটারি হওয়া যে কতটা কঠিন কাজ, তা লেভিটের মেয়াদের দিকে তাকালে পরিষ্কার হয়। এই প্রশাসনে ‘বক্তব্যে শৃঙ্খলা’ শব্দটি একদমই খাটে না। ট্রাম্প এক মিনিটে এক কথা বলেন, আবার পরের মিনিটেই ১০০% উল্টো পথে হাঁটেন। লেভিটকে এই খামখেয়ালি মেজাজের সাথে প্রতিনিয়ত খাপ খাইয়ে নিতে হতো। এমনকি ট্রাম্পের আদেশে মেক্সিকো উপসাগরের নাম বদলে ‘আমেরিকা উপসাগর’ করতে রাজি না হওয়ায় তিনি বার্তা সংস্থা এপির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। এ ধরনের কাজগুলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখা হলেও ট্রাম্পের কাছে এগুলো ছিল তার ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।
সমালোচকদের মতে, লেভিট হোয়াইট হাউসে এমন এক সংস্কৃতি চালু করেছিলেন যেখানে সঠিক তথ্য নয়, বরং ট্রাম্পের অতিশয়োক্তিপূর্ণ প্রশংসা করাই ছিল প্রধান কাজ। তিনি ব্রিফিং রুমে পেশাদার সাংবাদিকদের বদলে ট্রাম্পপন্থী পডকাস্টার ও স্থানীয় রেডিও উপস্থাপকদের বেশি গুরুত্ব দিতেন। এর ফলে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় ৫০% কমে গেছে বলে অনেক মিডিয়া বিশ্লেষক মনে করেন। ডেমোক্রেটিক দলের প্রতিনিধি জেমস ওয়াকিনশ রসিকতা করে বলেন, ‘ট্রাম্পের মুখপাত্র হতে গেলে আপনাকে প্রতিদিন জেনেশুনে বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে হবে।’ লেভিট সেই কঠিন কাজটি বেশ সাবলীলভাবেই করে আসছিলেন।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, লেভিটের জায়গায় কে আসছেন? ট্রাম্পের মতো খামখেয়ালি প্রেসিডেন্টের জন্য নতুন কাউকে খুঁজে পাওয়া বেশ বেগ পেতে হবে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, লেভিট চলে যাওয়ায় ট্রাম্প হয়তো নিজেই নিজের মুখপাত্র হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, তার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই যথেষ্ট। তবে লেভিট যে শূন্যতা রেখে গেলেন, তা পূরণ করা সহজ নয়। ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের প্রায় ৭০% জুড়ে ছিল লেভিটের মতো একজন সাহসী ও বাচাল মুখপাত্রের উপস্থিতি, যিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকতেন।
পরিশেষে, ক্যারোলাইন লেভিট হয়তো পারিবারিক কারণেই বিদায় নিচ্ছেন, কিন্তু হোয়াইট হাউসে তার রেখে যাওয়া কাজের কৌশল ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময় চর্চিত হবে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নয়, বরং তাদের সাথে সরাসরি লড়াই করে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সম্ভব। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতার প্রদর্শনে লেভিট ছিলেন তার এক অমূল্য সহযোগী। ভবিষ্যতে তাকে হয়তো বড় কোনো রক্ষণশীল টেলিভিশন চ্যানেলের টক শো-তে দেখা যাবে, যেখানে তিনি ট্রাম্পের ‘মাগা’ (MAGA) আদর্শের কথা আরও উচ্চস্বরে প্রচার করবেন।
















