ঝিনাইদহের শৈলকুপায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নদী দূষণ রোধে এক সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ১৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখ ভোর ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে যখন চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা এবং সাধারণ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই শৈলকুপা থানার একটি চৌকস দল কালী নদীর পাড়ে অভিযান পরিচালনা করে। নদীর পবিত্রতা রক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত এই অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়েন দুই ব্যক্তি, যারা শহরের যাবতীয় নোংরা ও বর্জ্য পদার্থ নদীতে নিক্ষেপ করছিলেন। দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই ঝটিকা অভিযান সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হলেন শৈলকুপা থানার হাজামপাড়া গ্রামের মৃত আত্তাপ মন্ডলের ছেলে মোঃ আক্কাস মন্ডল (৫০) এবং সাতগাছি গ্রামের বাসিন্দা মৃত দিয়ানত শেখের ছেলে মোঃ কালু শেখ (৫৫)। পুলিশ জানায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে রাতের অন্ধকারে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে বর্জ্য ফেলে আসছিলেন। এতে নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছিল এবং প্রায় ৯৫% জলজ প্রাণী হুমকির মুখে ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের অপরাধস্থলেই আটক করতে সক্ষম হয়।
আটক করার পর আসামিদের দ্রুত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্ট বসানো হয়। বিচারক উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন এবং অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করেন। দেখা যায় যে, এই দূষণের ফলে নদীর পানির গুণমান ১০০% নষ্ট হচ্ছে, যা কৃষিকাজ ও মাছ ধরার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিচারক তখন পানি সরবরাহ ও পয়নিস্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৬ এর ৫২(১) ধারা মোতাবেক আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করেন। অপরাধ স্বীকার করায় আদালত তাদের উভয়কে মোট ১০,০০০/- (দশ হাজার) টাকা নগদ জরিমানা প্রদান করেন।
এই অভিযানের বিষয়ে শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, নদী আমাদের জাতীয় সম্পদ। কিছু অসাধু মানুষ নিজের সামান্য লাভের জন্য বা অলসতার কারণে নদীর পানিতে বিষাক্ত বর্জ্য মিশিয়ে দিচ্ছে। এতে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তা টাকার অংকে পরিমাপ করা অসম্ভব। তবে আমরা হিসেব করে দেখেছি, এই দূষণ রোধ না করলে প্রতি বছর এই এলাকায় প্রায় $৫,০০০ মূল্যের মৎস্য সম্পদ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই আমরা কঠোর অবস্থানে গিয়েছি যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন সাহস না দেখায়।
শৈলকুপার স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা এই শাস্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, জরিমানা হয়তো ১০,০০০ টাকা, কিন্তু এর প্রভাব অনেক সুদূরপ্রসারী। নদীর পানি দূষিত হওয়ার কারণে এলাকার শিশুদের মধ্যে চর্মরোগের হার প্রায় ২০% বেড়ে গিয়েছিল। এছাড়া নদীর তলদেশে প্লাস্টিক ও বর্জ্য জমে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। সরকারি এই হস্তক্ষেপে নদীটি তার হারানো যৌবন ফিরে পাবে বলে স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করছেন। প্রশাসন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নদী দখল বা দূষণকারীর বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
পরিশেষে, আদালত থেকে জরিমানা আদায়ের পর আসামিদের কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাদের জানানো হয় যে, পরবর্তীতে একই অপরাধ করলে কারাদণ্ডসহ দ্বিগুণ জরিমানা গুণতে হবে। ওসি সাহেব সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা নদীকে ভালোবাসুন। কোথাও কোনো দূষণ দেখলে বা কাউকে ময়লা ফেলতে দেখলে সাথে সাথে থানাকে অবহিত করুন। আমাদের এই অভিযান ১০০% সফল করতে জনগণের অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। ঝিনাইদহ জেলার প্রতিটি নদীকে বর্জ্যমুক্ত করার লক্ষে এই ধরনের অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে থানা সূত্রে জানানো হয়েছে।
শৈলকুপার এই ঘটনাটি আশেপাশের এলাকাগুলোতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় আইনের প্রয়োগ কতটা জরুরি, তা এই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে এই স্লোগানকে সামনে রেখে শৈলকুপা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন একসাথে কাজ করে যাচ্ছে। আগামী দিনে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন ও মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে এই পদক্ষেপগুলো মাইলফলক হয়ে থাকবে। স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা, শুধু জরিমানা নয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন তৈরি করা হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।
















