দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চরম সংকট: সরকারের ব্যর্থতায় জামায়াতের কড়া হুঁশিয়ারি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন এখন ওষ্ঠাগত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে এই সংকটের জন্য সরাসরি সরকারকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে এবং এই পরিস্থিতির কারণে যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার পুরো দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে। আজ বৃহস্পতিবার এক বিশেষ বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের জ্বালানি খাতের এই নাজুক অবস্থা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সম্প্রতি দেশে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। গত কয়েক দিনের পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ আগস্ট দেশে ৩,৬৭১ মেগাওয়াট, ১০ আগস্ট ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট, ১১ আগস্ট ৩,৪৬৫ মেগাওয়াট এবং ১২ আগস্ট ৩,৩৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে। এর ফলে গ্রাম ও শহর উভয় অঞ্চলেই মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে। এই ঘাটতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ছে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে।

বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাসের হাহাকারও এখন তুঙ্গে। গত ১২ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ২০৩ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় মাত্র ৫৩% গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না যেমন বন্ধ থাকছে, তেমনি কলকারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্পমালিক তাদের কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে দেশের রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও দলীয়করণের ফলে আজ এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি মনে করেন, সরকার যদি সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা নিত, তবে আজ জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা তৈরি হতো না। জ্বালানি খাতকে বেসরকারীকরণের নামে পুরোনো ব্যবসায়িক অলিগার্ক বা বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে নতুন করে সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার বড় একটি অংশ দুর্নীতির কারণে নষ্ট হচ্ছে। এতে সাধারণ গ্রাহকের পকেট কাটলেও সেবার মান উন্নত হচ্ছে না।

দেশের বিভিন্ন জেলার বিদ্যুৎ সরবরাহের চিত্র আরও ভয়াবহ। যেমন নীলফামারীতে যেখানে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন, সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৪৫ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৪০% বিদ্যুৎ সেখানে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কুষ্টিয়া জেলায় ১৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ মিলছে মাত্র ৮৫ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট। দেশের অধিকাংশ জেলাতেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মফস্বল এলাকাগুলোতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। এই বৈষম্যমূলক বিদ্যুৎ বণ্টনের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে এবং অনেকেই রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে, দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে যে, বিদ্যুৎ না পেয়ে ক্ষুব্ধ জনতা যেকোনো সময় বিদ্যুৎ অফিসগুলোতে হামলা করতে পারে। এটি সরকারের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত ব্যর্থতার একটি প্রমাণ। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন একমাত্র সমাধান। সাধারণ মানুষ শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কাজের কাজ দেখতে চায়।

জ্বালানি সংকটের ফলে শিক্ষা ও উৎপাদন খাতের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা অপূরণীয়। বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীরা রাতে পড়াশোনা করতে পারছে না, যা তাদের পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নিয়মিত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। মিয়া গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, গ্যাস ও তেল পাচার রোধে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। তিনি আরও বলেন, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে সরকার চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে। যদি আগে থেকে নতুন কূপ খনন করা হতো, তবে আজ বিদেশ থেকে দামী এলএনজি আমদানির প্রয়োজন হতো না। এতে করে দেশের প্রায় $১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হতো।

পরিশেষে, জামায়াতের এই নেতা সরকারকে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শিল্প খাতে গ্যাস চুরি বন্ধ করা, সিস্টেম লস কমানো এবং এনার্জি কনভার্শনের আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর কমানো দরকার। এছাড়া দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধানে বিদেশি দক্ষ অংশীদারদের যুক্ত করার প্রস্তাবও দেন তিনি। জনগণের ধৈর্য এখন বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। সরকার যদি দ্রুত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যার সমাধান না করে, তবে সামনে বড় ধরনের গণরোষের মুখে পড়তে হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই।

সম্পর্কিত নিবন্ধ