বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল: শিক্ষকতা থেকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার এক দীর্ঘ পথচলা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের রাজনীতির এক পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, আজ সেই পথ তাকে নিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে। বিএনপি তাকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। যেহেতু বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রায় ১০০% এবং রাজনৈতিক সমীকরণ তাদের পক্ষেই রয়েছে, তাই মির্জা ফখরুলই যে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, তা এখন নিশ্চিত। ইতিমধ্যে তিনি তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয় অর্থাৎ দলের মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ২০ আগস্ট তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেবেন।

মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন ওই এলাকার প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাসের পর তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত তুখোড়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সেই উত্তাল সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে কারাবরণও করতে হয়েছিল।

দেশ স্বাধীনের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি রাজনীতিতে না গিয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারের মাধ্যমে তিনি ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে তিনি তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮২ সালে আবার তিনি তার প্রিয় শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। এরপর ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতা থেকে রাজনীতিতে আসার এই যে রূপান্তর, তা বাংলাদেশে খুব কম নেতার জীবনেই দেখা যায়।

সক্রিয় রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। ওই বছর তিনি কোনো দলীয় পরিচয় ছাড়াই ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও ২০০১ সালে তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার সততা ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি তাকে দলের ভেতরে ও বাইরে সমানভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। বিশেষ করে ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার মতো মফস্বল এলাকাগুলোতেও তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

২০১১ সালে বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। ২০১৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিবের দায়িত্ব পান। দীর্ঘ সময় রাজপথের বিরোধী দলের মুখ হিসেবে তিনি কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হওয়ার পর তাকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিনি প্রায় $১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ তদারকি করেছেন, যা দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। এখন তিনি দলের গণ্ডি পেরিয়ে সবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে রয়েছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল অত্যন্ত সাদামাটা মানুষ। তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম একটি বিমা কোম্পানিতে কাজ করেন। তাদের দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ দুজনেই অত্যন্ত মেধাবী। বড় মেয়ে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে গবেষণায় নিয়োজিত এবং ছোট মেয়ে ঢাকায় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। ফখরুলের পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তাকে এই সম্মানজনক পদে আসীন করতে সাহায্য করেছে।

ঠাকুরগাঁওবাসী তাদের প্রিয় নেতার এই সাফল্যে আনন্দিত হলেও কিছুটা বিষণ্ণ। তার ছোটবেলার বন্ধু অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, “ফখরুল রাষ্ট্রপতি হচ্ছে এটা আমাদের জন্য ১০০% গর্বের বিষয়। কিন্তু সে বঙ্গভবনে চলে গেলে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ তার সরাসরি ছায়া থেকে কিছুটা বঞ্চিত হবে।” মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমন একজন মানুষ যিনি শিক্ষকতা, সাহিত্য, ক্রীড়া ও রাজনীতি সবক্ষেত্রেই সমান পদচারণা করেছেন। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার এই নতুন পথচলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে অনেকে আশা করছেন। আগামী ২০ আগস্ট তার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এক নতুন অধ্যায়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ