মহেশপুরে জমি নিয়ে বিরোধে বসতবাড়িতে হামলা: দুই নারীকে মারধর ও স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের মহেশপুরে জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিনের শত্রুতার জেরে এক বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার আজমপুর ইউনিয়নের মালাধরপুর গ্রামে এক বৃদ্ধের বসতবাড়িতে ঢুকে দুই নারীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। শুধু মারধরই নয়, অভিযোগ উঠেছে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে নগদ টাকা ও কয়েক লাখ টাকার স্বর্ণালংকার লুটে নেওয়ার। গত ৯ আগস্ট দুপুরে ঘটা এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মহেশপুর থানায় ইতিমধ্যে এই বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

আদালত ও থানা সূত্রে জানা যায়, ৮৯ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুল হামিদের পরিবারের সাথে প্রতিবেশী কয়েকজনের জমি নিয়ে অনেকদিন ধরেই ঝামেলা চলছিল। এই বিরোধ মীমাংসার বদলে দিন দিন আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। ঘটনার দিন দুপুর প্রায় ১টা ২০ মিনিটের দিকে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একদল লোক অতর্কিতভাবে আব্দুল হামিদের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা সংখ্যায় প্রায় ১০-১২ জন ছিল বলে জানা গেছে। তারা বাড়ির গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাণ্ডব শুরু করে। বাড়ির পুরুষরা তখন বাইরে থাকায় মহিলারা একাই পরিস্থিতির শিকার হন।

হামলাকারীরা বৃদ্ধ আব্দুল হামিদের স্ত্রী ৭০ বছর বয়সী রোকেয়া বেগম এবং তার পুত্রবধূ ২৫ বছর বয়সী রুপালীকে টার্গেট করে। অভিযুক্তরা প্রথমে তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। যখন তারা এর প্রতিবাদ করেন, তখন সন্ত্রাসীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, রোকেয়া বেগমের চুলের মুঠি ধরে তাকে উঠানে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসা হয়। এরপর লোহার রড ও বাঁশের লাঠি দিয়ে বৃদ্ধার শরীরে এলোপাথাড়ি আঘাত করা হয়। শাশুড়িকে বাঁচাতে রুপালী এগিয়ে এলে তাকেও রেহাই দেয়নি হামলাকারীরা। তাকে মারধর করে পরনের কাপড় ছিঁড়ে শ্লীলতাহানি করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক। সন্ত্রাসীরা ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র এবং বারান্দায় থাকা একটি দামী মোটরসাইকেল ভেঙে তছনছ করে দেয়। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, এতে তাদের প্রায় ৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে, যা বর্তমান বাজার মূল্যে প্রায় $২৫০০ ডলারের সমান। এছাড়া ঘরে রাখা জরুরি খরচের ১৫ হাজার টাকা এবং দেড় ভরি ওজনের দুটি সোনার চেইন ছিনিয়ে নিয়ে যায় তারা। বর্তমান বাজারে দেড় ভরি সোনার দাম প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা বা প্রায় $২৭৫০ ডলার। অর্থাৎ লুটপাট ও ভাঙচুর মিলিয়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ টাকার উপরে।

বাংলাদেশে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ গ্রামীণ সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের আদালতগুলোতে চলমান দেওয়ানি মামলার প্রায় ৭৫% সরাসরি জমি সংক্রান্ত। মহেশপুরের এই ঘটনাটি সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতারই প্রতিফলন। প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক থাকার বদলে সাধারণ মানুষ এখন সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে হামলা করতে দ্বিধা করছে না। মালাধরপুর গ্রামের এই ঘটনায় স্থানীয়রা এগিয়ে না এলে প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটতে পারত। হামলাকারীরা পালানোর সময় পরিবারটিকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়ে গেছে।

আহত দুই নারীকে উদ্ধার করে দ্রুত কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। বৃদ্ধা রোকেয়া বেগমের শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালশিটে দাগ পড়ে গেছে। হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তারা বাড়িতে ফিরলেও মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। আব্দুল হামিদ জানান, ঘটনার পর সবাই আতঙ্কে ছিল এবং হাসপাতালে ছোটাছুটির কারণে থানায় যেতে কয়েকদিন দেরি হয়েছে। তিনি এখন প্রশাসনের কাছে শুধু সুবিচার চান। তার মতে, নিজের ভিটেমাটিতে যদি স্ত্রী-সন্তান নিরাপদ না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না।

মহেশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান বিষয়টিকে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখছেন। তিনি জানান, পুলিশের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জমি নিয়ে বিরোধের সত্যতা পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে ঘটনার বিস্তারিত খতিয়ে দেখছি। এজাহারে নাম থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।” আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই আশ্বাসে ভুক্তভোগী পরিবার কিছুটা স্বস্তি পেলেও হামলাকারীরা এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় রয়েছে।

বর্তমানে গ্রামটিতে এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মতে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এই ধরনের অপরাধ আরও বাড়বে। অপরাধীরা প্রায়ই রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের মনে ভীতির জন্ম দেয়। মহেশপুর থানা পুলিশ যদি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, তবেই এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। বৃদ্ধ আব্দুল হামিদের পরিবারটি এখন বিচারের প্রহর গুনছে, যেন আর কোনো বৃদ্ধ বাবা কিংবা গৃহবধূকে জমি নিয়ে বিরোধের বলী হতে না হয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ