নাচোলে স্কুল কমিটি নিয়ে হট্টগোল: মিথ্যা প্রচারণার প্রতিবাদে গ্রামবাসীর বিশাল মানববন্ধন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার ভাতসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবগঠিত পরিচালনা কমিটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। কমিটির বিরুদ্ধে করা একটি ‘মিথ্যা’ মানববন্ধনের প্রতিবাদে এবার সশরীরে মাঠে নেমেছেন সাধারণ গ্রামবাসী ও অভিভাবকরা। বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে ভাতসা গ্রামের মানুষ বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় জড়ো হয়ে এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন। এই কর্মসূচিতে এলাকার শত শত নারী-পুরুষ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়ে বর্তমান কমিটির বৈধতার পক্ষে নিজেদের জোরালো অবস্থান পরিষ্কার করেন।

এই সমস্যার শুরু হয়েছিল গত ১১ আগস্ট। সেদিন সভাপতি পদপ্রার্থী শহিদুল ইসলাম রিপন এবং তার কয়েকজন সমর্থক বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে একটি কথিত মানববন্ধন করেছিলেন। আজকের প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেওয়া অভিভাবক মারুফা খাতুন ও আল রায়হান বলেন, রিপন সাহেব সভাপতি হওয়ার জন্য লড়েছিলেন, কিন্তু ভোটের দিন তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ১টি ভোট। এই পরাজয় মেনে নিতে না পেরে তিনি এখন উল্টোপাল্টা কথা বলছেন। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নয় বরং সরকারি পরিপত্র মেনে ১০০% স্বচ্ছতার সাথে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরাজিত হয়ে রিপন সাহেব এখন গ্রামের শান্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছেন।

মানববন্ধনে পরেশ মারডি নামের এক অভিভাবক বলেন, “আমরা চাই আমাদের বাচ্চাদের স্কুলে পড়াশোনা ঠিকমতো চলুক। একটি সুন্দর কমিটির মাধ্যমে স্কুলটি যখন নিয়মমাফিকভাবে চলতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই কিছু স্বার্থান্বেষী লোক ঝামেলা পাকাচ্ছে।” নবগঠিত কমিটির সদস্য বুলবুলি বেগমও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, ভোটারদের রায়ে যে কমিটি হয়েছে তাকে অবৈধ বলা মানে পুরো গ্রামের মানুষের মতামতকে অপমান করা। বক্তারা অভিযোগ করেন, যারা স্কুলের উন্নয়ন চায় না তারাই মূলত বাইরে থেকে লোক ভাড়া করে এনে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ভাতসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খালেদা বেগম বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমি নিশ্চিত করছি যে, পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ম মেনেই শেষ হয়েছে। অথচ একটি মহল আমার ব্যক্তিগত সম্মানহানি করার জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে। আমি এই ধরণের ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কর্মসূচির তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। তিনি মনে করেন, মুষ্টিমেয় কিছু লোক স্কুলের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কুক্ষিগত করতে না পেরে এখন স্কুলের স্থিতিশীল পরিবেশ নষ্ট করার পায়তারা করছে।

বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের বক্তব্য খুবই পরিষ্কার। শিক্ষা অফিসার মজনু মিঞা সাংবাদিকদের জানান, বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি গঠনের পর যখন অভিযোগ উঠেছিল, তখন তারা বিষয়টি হালকাভাবে নেননি। সহকারী শিক্ষা অফিসার মাকশুদুল হককে দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্তে দেখা গেছে, কমিটি গঠনে কোনো প্রশাসনিক অনিয়ম হয়নি এবং রিপন সাহেবের অভিযোগগুলোর কোনো সত্যতা মেলেনি। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরেই এই নবগঠিত কমিটিকে চূড়ান্ত বৈধতা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা অফিসার সাফ জানিয়ে দেন, নিয়মের মধ্যে থেকে কোনো কাজ করলে সেখানে তৃতীয় পক্ষের অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।

বর্তমানে এলাকায় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে এক ধরণের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিরাও জানিয়েছেন যে, ভাতসা গ্রামের সাধারণ মানুষ এই বর্তমান কমিটির ওপর আস্থা রাখছে। শিক্ষা অফিসার মজনু মিঞা আরও বলেন, “আমরা পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশ বজায় রাখা আমাদের এক নম্বর লক্ষ্য। প্রয়োজনে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেব।” স্কুল কমিটি নিয়ে যে রাজনীতি শুরু হয়েছে তা যেন কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনায় কোনো প্রভাব না ফেলে, সেটি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।

সব মিলিয়ে ভাতসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই বর্তমান কমিটি এখন শতভাগ বৈধ হলেও স্থানীয় কোন্দল মেটানোই এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রামের মানুষের দাবি, যারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। তারা মনে করেন, স্কুলের পরিবেশ শান্ত থাকলে গ্রামের সন্তানদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। আজকের এই পাল্টা মানববন্ধন মূলত সেই সচেতনতারই বহিঃপ্রকাশ। গ্রামবাসী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা এই বৈধ কমিটির পাশেই আছেন এবং যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে তারা প্রস্তুত।

সম্পর্কিত নিবন্ধ