দীর্ঘ ২৩ বছরের লম্বা অপেক্ষা শেষে আবারও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ। সবশেষ ২০০৩ সালে অজিদের ডেরায় লাল-সবুজ জার্সিধারীরা সাদা পোশাকে মাঠে নেমেছিল। এরপর দুই দেশের মধ্যে আরও ৪টি টেস্ট হলেও তার প্রতিটিই অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে। কাল ডারউইনের সেই চেনা মাঠে সপ্তম লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে দুই দল। পরিসংখ্যান বলছে, এখন পর্যন্ত খেলা ৬টি টেস্টের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া জিতেছে ৫টিতে, আর বাংলাদেশের জয় মাত্র ১টি। অর্থাৎ জয়ের হার মাত্র ১৬.৬৭%। তবুও ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা, আর সেই রোমাঞ্চ নিয়েই নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে মাঠে নামছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল বেশ তেতো। ২০০৩ সালে ডারউইন ও কেয়ার্নস টেস্টে টাইগাররা পাত্তাই পায়নি। ডারউইনের প্রথম টেস্টে গ্লেন ম্যাকগ্রা আর ব্রেট লি’র গতির আগুনে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে মাত্র ৯৭ রানে গুটিয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া ৪০৭ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করলে চাপে পড়া বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসেও বড় কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। ১৭৮ রানে অলআউট হয়ে ইনিংস ও ১৩২ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে যায় বাংলাদেশ। পরের কেয়ার্নস টেস্টেও একই চিত্র দেখা যায়। হান্নান সরকারের ৭৬ আর হাবিবুল বাশারের ৪৬ রানের লড়াকু ইনিংসে ২৯৫ রান তুললেও অজিদের ড্যারেন লেম্যানের অপরাজিত ১৭৭ রানের ঝড়ে অস্ট্রেলিয়া ৫৫৬ রানের পাহাড় গড়ে। বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬৩ রানে থমকে গেলে ইনিংস ও ৯৮ রানের হার নিশ্চিত হয়।
২০০৬ সালে ফতুল্লা টেস্টে বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। এটি ছিল টাইগারদের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় এক লড়াই। শাহরিয়ার নাফীসের দুর্দান্ত ১৩৮ আর হাবিবুল বাশারের ৭৬ রানে ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৭ রানের বিশাল স্কোর গড়ে। জবাবে অজিরা ২৬৯ রানে অলআউট হলে বাংলাদেশ ১৫৮ রানের বিশাল লিড পায়। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ ১০০% ব্যর্থ হয়ে মাত্র ১৪৮ রানে ভেঙে পড়ে। ৩০৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে রিকি পন্টিংয়ের অপরাজিত ১১৮ রানের ইনিংসে ভর করে ৩ উইকেট হাতে রেখে কষ্টার্জিত জয় পায় অস্ট্রেলিয়া। তবে সেই ম্যাচেই বাংলাদেশ জানান দিয়েছিল, তারা এখন আর ছোট দল নয়।
২০১৭ সালে মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশ সেই অপূর্ণতা পূরণ করে। এটি ছিল বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সেরা জয়গুলোর একটি। প্রথম ইনিংসে সাকিব আল হাসানের ৮৪ রানে ভর করে ২৬০ রান তোলে বাংলাদেশ। জবাবে অস্ট্রেলিয়া ২১৭ রানে অলআউট হলে টাইগাররা ৪৩ রানের লিড পায়। দ্বিতীয় ইনিংসে ২২১ রান করার পর অস্ট্রেলিয়ার সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৫ রান। ডেভিড ওয়ার্নার সেঞ্চুরি করে জয়ের সম্ভাবনা জাগালেও সাকিবের ঘূর্ণি জাদুতে পথ হারায় অজিরা। দুই ইনিংস মিলিয়ে সাকিব ১০টি উইকেট নেন। শেষ পর্যন্ত ২৪৪ রানে অলআউট হয়ে ২০ রানের হার মানে অস্ট্রেলিয়া। টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অজি বধের উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে টাইগারদের নিবেদন ছিল দেখার মতো।
সিরিজের শেষ টেস্ট হয়েছিল চট্টগ্রামে। ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে মুশফিক ও সাব্বিরের ব্যাটে ভর করে ৩০৫ রান করে। কিন্তু ডেভিড ওয়ার্নারের ১২৩ রানের অনবদ্য ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ৩৭৭ রান করে ৭২ রানের লিড নেয়। দ্বিতীয় ইনিংসে নাথান লায়নের স্পিন বিষে নীল হয়ে বাংলাদেশ মাত্র ১৫৭ রানে অলআউট হয়ে যায়। লায়ন একাই দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৩টি উইকেট নিয়েছিলেন। ফলে মাত্র ৮৬ রানের লক্ষ্য পায় অস্ট্রেলিয়া এবং ৭ উইকেটে জয় তুলে নিয়ে সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ করে।
কালকের ম্যাচটি নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা কাজ করছে। ডারউইনের পিচ সবসময়ই পেসারদের জন্য সহায়ক, যেখানে নাহিদ রানার মতো তরুণ পেসাররা বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। গত দুই দশকে বাংলাদেশের ক্রিকেটে অর্থের জোগান এবং সুযোগ-সুবিধা প্রায় ৫০০% বৃদ্ধি পেয়েছে। বিসিবি ও নির্বাচকরা মনে করছেন, বর্তমান দলটির যে সক্ষমতা আছে, তাতে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয়ের খরা কাটানো অসম্ভব কিছু নয়। ২৩ বছর আগের সেই স্মৃতি মুছে দিয়ে নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটাররা কাল ডারউইনের মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে প্রস্তুত। গ্যালারিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও পতাকা হাতে তৈরি হচ্ছেন বাঘের গর্জন তোলার জন্য।
















