জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বড় উদ্যোগ: যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসছে ১১৭ কার্গো এলএনজি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এবং জ্বালানি সংকট দূর করতে এক বিশাল ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার বড় একটি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। ২০২৬ সাল থেকে শুরু করে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ বছর ধরে এসব গ্যাস ধাপে ধাপে দেশে আসবে। সরকারের এই উদ্যোগটি দেশের শিল্প কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের গানভর ইউএসএ এলএলসির কাছ থেকে এই বিপুল পরিমাণ এলএনজি কেনা হবে। চুক্তির শর্তানুসারে, ২০২৬ সালে ৫ কার্গো, ২০২৭ সালে ৬ কার্গো এবং ২০২৮ সালে আরও ৬ কার্গো গ্যাস আসবে। পরবর্তী ১০ বছর অর্থাৎ ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০ কার্গো করে এলএনজি সরবরাহ করবে মার্কিন এই কোম্পানিটি। এসব গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হবে আন্তর্জাতিক বাজার বা জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) দরের ভিত্তিতে। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী, জেকেএম মূল্যের সাথে প্রতি এমএমবিটিইউ-তে শূন্য দশমিক শূন্য ৮৭৫ মার্কিন ডলার যোগ করে চূড়ান্ত মূল্য পরিশোধ করবে বাংলাদেশ। এছাড়া হংকং, মালয়েশিয়া ও চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আরও ৮ কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাবও একই সভায় পাস হয়েছে।

কেবল জ্বালানি নয়, দেশের কৃষি খাতের উন্নয়ন ও কৃষকদের সার সংকট কাটাতেও বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। আগামী মৌসুমে কৃষি উৎপাদন যেন ১০০% নিশ্চিত হয়, সেজন্য সৌদি আরব ও মরক্কো থেকে ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আসবে। পাশাপাশি মরক্কোর ওসিপি নিউট্রিক্রপস থেকে দুই লটে মোট ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকার মনে করছে, সময়মতো সার সরবরাহ করতে পারলে ফসল উৎপাদন বাড়বে এবং বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভিয়েতনাম থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন নন-বাসমতি সেদ্ধ চাল কেনার প্রস্তাবও এই বৈঠকে পাস হয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন চালের দাম পড়বে ৪৩৬ মার্কিন ডলার। এছাড়া দেশের মানুষের আটার চাহিদা মেটাতে ১ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানির জন্য দুটি আলাদা প্রস্তাব অনুমোদন করেছে কমিটি। বাজারের মজুত বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দাম রাখতে এই খাদ্যশস্যগুলো দ্রুত দেশে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চাল ও গমের এই বড় চালানগুলো সরকারি গুদামে মজুত রাখা হবে, যাতে আপদকালীন সময়ে কোনো সংকট তৈরি না হয়।

বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য টিসিবির মাধ্যমে নিত্যপণ্য সরবরাহ বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বেশ কিছু প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় প্রতিষ্ঠান নাবিল ফুডস থেকে ১০ হাজার টন মসুর ডাল কেনা হবে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া থেকে ২ কোটি টন সয়াবিন তেল কেনার বিশাল এক প্রস্তাব সবুজ সংকেত পেয়েছে। যদিও এই পরিমাণটি অনেক বড়, তবে দীর্ঘমেয়াদী মজুত নিশ্চিত করতেই সরকার এই সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব পণ্য ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায্য মূল্যে পৌঁছে দেওয়া হবে যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমে আসে।

সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও ডিজিটাল করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পের জন্য অ্যান্ড্রয়েড ট্যাব কেনার একটি বড় প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। প্রায় ৩২১ কোটি টাকা খরচ করে এই ট্যাবগুলো কেনা হবে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস এসব ট্যাব সরবরাহ করবে। এর ফলে সরকারি সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা আসবে এবং প্রকৃত অভাবী মানুষ সহজেই তাদের পাওনা বুঝে পাবেন। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে ফেনী সড়ক বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা প্রশস্ত করার প্রকল্পের পুনঃদরপত্রও এই সভায় চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে বুধবারের বৈঠকে মোট ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও অনুমোদন দেওয়া হয়। শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এই সমন্বিত সিদ্ধান্তগুলো দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিটি জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন করে আস্থা জোগাবে। সরকার বিশ্বাস করে, এই বিশাল বিনিয়োগের সুফল দেশের সাধারণ মানুষ খুব শীঘ্রই ভোগ করতে পারবে এবং সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এটি বিশেষ অবদান রাখবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ