রাজধানী ঢাকার আকাশচুম্বী দালান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ঘর সবখানেই বুধবার রাতটি কেটেছে চরম অস্থিরতায়। ভ্যাপসা গরমের মধ্যে হঠাৎ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং রাজধানীবাসীর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, বুধবার রাত ৯টা থেকে শুরু করে রাত দেড়টা পর্যন্ত অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। কোথাও এক ঘণ্টা, আবার কোথাও টানা দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। ফ্যানের বাতাস ছাড়া এই প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছিল।
ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ইস্কাটন গার্ডেন, কাজীপাড়া, মৌচাক, কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, পশ্চিম রাজাবাজার, লালমাটিয়া ও মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট এলাকায় বিদ্যুতের এই ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়। সাধারণত এসব এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে চলে আসে, কিন্তু বুধবার রাতের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মৌচাক এলাকার এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ট্রান্সফরমারে সমস্যা হলেও ৫ থেকে ১০ মিনিটে ঠিক হয়ে যায়, অথচ কাল ৫০ মিনিটেও কারেন্ট আসেনি। শেওড়াপাড়ায় তো রাত ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত টানা এক ঘণ্টা অন্ধকার ছিল।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আনিকা তাসনিম তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “মাঝরাতে এমন দীর্ঘ সময় লোডশেডিং আমি এর আগে কখনও দেখিনি। এমনিতে প্রতি মাসে আগের তুলনায় প্রায় ৫০% বেশি বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে, অথচ সেবার মান কমছে। এই গরমে মশারি টাঙিয়েও ঘুমানো যাচ্ছে না কারণ ভেতরে দম বন্ধ হয়ে আসে।” কাজীপাড়ার এক সাংবাদিক রাহাত আহমেদ বলেন, গত তিন বছরের মধ্যে কাল রাতের লোডশেডিং ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। প্রচণ্ড গরম আর মশার অত্যাচারে ছোট শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধদের ভোগান্তি ছিল চরমে।
সারা দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, বুধবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩,৩৮২ মেগাওয়াট। গত কয়েক দিনের পরিসংখ্যানে এই ঘাটতি আরও বেশি ছিল। পিজিসিবি ও পিডিবির তথ্য মতে, গত সোমবার লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট, যা মঙ্গলবার ছিল ৩,৪৬৫ মেগাওয়াট। আরইবি বা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় সমস্যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। ১১ আগস্ট রাত ১২টার দিকে সারা দেশে যে ৩,৫৯২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে, তার মধ্যে কেবল আরইবির এলাকাতেই ছিল ৩,০৩৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মোট ঘাটতির প্রায় ৮৪% বহন করতে হয়েছে গ্রাম বা শহরতলির মানুষকে।
বিদ্যুৎ সংকটের মূলে রয়েছে গ্যাসের তীব্র অভাব। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, অথচ জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে মাত্র ২০৩ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৪৬% গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ১০ কোটি ঘনফুটেরও নিচে নেমে এসেছে। এই গ্যাস স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো তাদের পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে পারছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করে বলেছেন, গ্যাস সরবরাহের সমস্যার কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। সরকার বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০০% চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দিয়েছেন। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কবে নাগাদ এই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হবে? একদিকে অসহ্য গরম আর অন্যদিকে বিদ্যুতের এই চোর-পুলিশ খেলা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
ঢাকার মশার কামড় আর ভ্যাপসা গরমের মধ্যে মানুষ এখন বৃষ্টির প্রার্থনা করছেন। বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা আর জ্বালানি সংকট দূর না হলে এই ভোগান্তি হয়তো সহসাই কাটবে না। রাজধানীর মানুষ চান কেবল আশ্বাস নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং একটি বাসযোগ্য পরিবেশ। প্রতিটি দিন আর রাত এভাবে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কায় কাটানো মানুষের জন্য এক বড় মানসিক চাপে পরিণত হয়েছে।
















