“গাছের মাঝে নবাব জীবন, করবো আমরা বৃক্ষরোপণ” এই চমৎকার স্লোগানকে সামনে রেখে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক ব্যতিক্রমী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘নবস্বপ্ন ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং হাসপাতালের রোগীদের জন্য এক মনোরম ও নির্মল পরিবেশ তৈরি করতেই এই মহতী উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি।
নবস্বপ্ন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ফারহানা রহমান মিষ্টির সভাপতিত্বে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইলতুতমিশ আকন্দ। তিনি নিজের হাতে চারা রোপণ করে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মোঃ আব্দুল্লাহ আল ফারুক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) সাইদুর রহমান এবং হিসাবরক্ষক খালেদ মান্নান ওয়াসিমসহ ফাউন্ডেশনের একঝাঁক স্বেচ্ছাসেবী কর্মী।
অনুষ্ঠানে পরিবেশের ভয়াবহতা ও গাছের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, একটি আদর্শ দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে এই বনভূমির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সারা বিশ্বের গড় তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় অনেক এলাকা তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নবস্বপ্ন ফাউন্ডেশনের সদস্যরা জানান, যদি আমরা প্রত্যেকে অন্তত ১০০% সদিচ্ছা নিয়ে বছরে দুটি করে গাছ লাগাই, তবে আগামী কয়েক বছরে দেশের পরিবেশের তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে ফারহানা রহমান মিষ্টি বলেন, আমরা কেবল নামকাওয়াস্তে গাছ লাগাতে আসিনি। একটি চারা রোপণ করার পর সেটি বড় হওয়া পর্যন্ত দেখভাল করা আমাদের দায়িত্ব। কারণ দেখা গেছে, সঠিক পরিচর্যার অভাবে রোপণ করা চারার প্রায় ৪০% থেকে ৫০% অকালেই মারা যায়। তাই আমরা কেবল সাঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাছ লাগাইনি, বরং এখানকার কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেছি যেন তারা এই ছোট গাছগুলোর নিয়মিত যত্ন নেন। তিনি আরও বলেন, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ যে পরিমাণ অক্সিজেন দেয়, তা কৃত্রিমভাবে উৎপাদন করতে গেলে কয়েক হাজার ডলার খরচ করতে হতো। তাই গাছ লাগানো মানেই হলো এক বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের বিনিয়োগ করা।
প্রধান অতিথি ডা. ইলতুতমিশ আকন্দ এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, হাসপাতাল হলো সুস্থ হওয়ার জায়গা। এখানকার পরিবেশে যদি সবুজের সমারোহ থাকে, তবে রোগীরা মানসিকভাবে অনেক শান্তি পান। গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকলে রোগীদের সুস্থ হওয়ার গতি অন্তত ১০% থেকে ১৫% বেড়ে যায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, একটি বড় গাছ বছরে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নিতে পারে। সাঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে একটি সবুজ ও স্বাস্থ্যকর এলাকায় পরিণত করতে নবস্বপ্ন ফাউন্ডেশনের এই প্রচেষ্টা সত্যিই অতুলনীয়।
কর্মসূচিতে উপস্থিত অন্যান্য বক্তারা বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে গাছ লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের হার যে হারে বাড়ছে, তাতে আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। প্রতিটি মানুষের উচিত তার বাড়ির আশেপাশে বা পতিত জমিতে অন্তত ৫% জায়গা সবুজের জন্য বরাদ্দ রাখা। সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই বাগানটি বড় হলে তা কেবল ছায়া দেবে না, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটি ছোট ফুসফুসের মতো কাজ করবে।
কর্মসূচি শেষে নবস্বপ্ন ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা অঙ্গীকার করেন যে, তারা সাঘাটা উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে পর্যায়ক্রমে এ ধরনের কর্মসূচি পরিচালনা করবেন। তারা স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন রাস্তার পাশে কয়েক হাজার গাছের চারা লাগানোর একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে হাসপাতালের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় চারা রোপণ শেষে সেগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বেড়া দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা এই সামাজিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং তরুণ প্রজন্মের এমন সচেতনতামূলক কাজে উৎসাহিত হয়েছেন।
















