ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবায় এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। একদিনে হাসপাতালটিতে সাত-সাতটি সিজারিয়ান অপারেশন বা সিজার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যেখানে সরকারি হাসপাতালে জনবল ও সরঞ্জামের সংকট একটি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়, সেখানে একদিনে এতগুলো অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়াকে স্থানীয়রা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন। এই সাফল্যের পেছনে যেমন রয়েছে চিকিৎসকদের অদম্য সাহস, তেমনি জড়িয়ে আছে একজন দরিদ্র মায়ের প্রতি তাদের গভীর মানবিকতা। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো শৈলকুপা জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
আজকের দিনটি শুরু হয়েছিল ছয়টি সিজারের তালিকা দিয়ে। চিকিৎসকরা যখন একে একে সেই অপারেশনগুলো সম্পন্ন করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই হাসপাতালে একজন অত্যন্ত অভাবী প্রসূতি মাকে নিয়ে আসা হয়। তার অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন এবং দ্রুত সিজার করা প্রয়োজন ছিল। তালিকার বাইরে এমন বাড়তি চাপ সামলানো অনেক সময় চিকিৎসকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসকরা সেই অসহায় মায়ের আকুতি ফিরিয়ে দিতে পারেননি। শত ক্লান্তি সত্ত্বেও তারা সপ্তম সিজারটি করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তা সফলভাবে সম্পন্ন করেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে একজন মা ও নবজাতক নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের স্বাস্থ্যখাতে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও এর ব্যতিক্রম নয়। অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) হয়তো এখনো সব আধুনিক সুবিধা পৌঁছায়নি। প্রচণ্ড গরমে এসিটা ঠিকমতো কাজ করছিল না, প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা কেবিনের ব্যবস্থা করাও সম্ভব হয়নি। এমনকি হাসপাতালে বর্তমানে কোনো গাইনোকলজি বা শিশু বিভাগের কনসালটেন্ট নেই। সাধারণত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছাড়া এ ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার করতে অনেকেই দ্বিধাবোধ করেন। কিন্তু শৈলকুপার এই চিকিৎসকরা কেবল সাহসের ওপর ভর করে এই অসাধ্য সাধন করেছেন।
সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয় হলো, গত মাস থেকে এই হাসপাতালে নিয়মিত সিজার চালু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর কোনো ঘটনা ঘটেনি। অপারেশন থিয়েটার থেকে কোনো মা বা নবজাতকের কান্নার শব্দ আসেনি, বরং এসেছে নতুন প্রাণের হাসি। এই সাফল্যের হার এখন প্রায় ১০০%। যেখানে বেসরকারি ক্লিনিকে একটি সিজার করতে গেলে সাধারণ মানুষের অন্তত ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা খরচ হয়, যা প্রায় ২৫০বা৩০০
ডলারের সমান; সেখানে সরকারি এই হাসপাতালে নামমাত্র খরচে এই সেবা মিলছে। এটি নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য একটি বিশাল আশীর্বাদ।
এই পুরো কার্যক্রমটি পরিচালিত হচ্ছে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডাঃ আব্দুল্লাহ মামুন এবং ডাঃ মাহবুব আলম পারভেজের সরাসরি তত্ত্বাবধানে। তাদের এই সাহসিকতা ও দায়িত্বশীলতা ঝিনাইদহ অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রশংসিত হচ্ছে। তারা প্রমাণ করেছেন যে, সদিচ্ছা থাকলে সীমিত সম্পদের মধ্যেও সাধারণ মানুষকে উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব। তাদের এই যুদ্ধে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন একঝাঁক নার্স, স্যাকমো (SACMO), ওয়ার্ড বয় এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। প্রত্যেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ এই সাফল্য ধরা দিয়েছে।
হাসপাতালের এই নতুন কর্মচাঞ্চল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন বর্তমান আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান। তিনি এই হাসপাতালের পরিচালনা কমিটির দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকেই স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বিশেষ নজর দিয়েছেন। তার সরাসরি নির্দেশ ও সহযোগিতায় বন্ধ হয়ে থাকা সিজারিয়ান অপারেশন পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রশাসনের এই কঠোর তদারকি এবং চিকিৎসকদের আন্তরিকতা বজায় থাকলে শৈলকুপা হাসপাতালটি জেলার শ্রেষ্ঠ হাসপাতালে পরিণত হবে। পরিচালনা কমিটির নতুন এই উদ্যোগকে সাধারণ মানুষ সাধুবাদ জানাচ্ছে।
চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হওয়া একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি। শৈলকুপা হাসপাতালের আজকের এই চিত্রটি সেই আস্থার জায়গাটিকে আরও মজবুত করেছে। যখন রোগীরা দেখেন যে ডাক্তাররা তাদের কথা শুনছেন এবং অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তখন পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের সম্মান বেড়ে যায়। সরকারি হাসপাতালে সেবার মান নিয়ে যারা সমালোচনা করেন, আজকের এই ঘটনা তাদের জন্য একটি বড় জবাব। শৈলকুপার সাধারণ মানুষ এখন তাদের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখন নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষা। যেখানে সেবা নিতে আসা মানুষের চোখে থাকবে তৃপ্তি এবং ডাক্তারদের মুখে থাকবে সাফল্যের হাসি। বিশেষজ্ঞ কনসালটেন্ট না থাকার অভাব হয়তো একদিন মিটে যাবে, কিন্তু আজকে চিকিৎসকরা যে মানবিকতার পরিচয় দিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আমরা আশা করি, শৈলকুপার এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকবে এবং এখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সারা দেশের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালগুলোও সাধারণ মানুষের সেবায় আরও বেশি নিবেদিত হবে।
















