প্রাথমিক বৃত্তিতে বৈষম্যমুক্ত সমান সুযোগের দাবি: রাজপথে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকরা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজমান দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন। একইসাথে তারা থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক বৃত্তি কোটা পুনরায় চালুর জোর দাবি তুলেছেন। শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর দোয়েল চত্বর সংলগ্ন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশাল জেলা প্রতিনিধি সম্মেলনে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়। দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে দেশের ৬৪টি জেলা থেকে কয়েকশ শিক্ষক প্রতিনিধি, শিক্ষানুরাগী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশ নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।

সম্মেলনে আসা বক্তারা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেন। তারা জানান, বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৮০% কোটা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে মাত্র ২০% কোটা। এই ব্যবস্থার কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করার পরেও শুধু ‘কোটা’ না থাকায় বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বক্তাদের মতে, মেধার বিচার হওয়া উচিত ফলাফলের ভিত্তিতে, কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের ধরণের ওপর ভিত্তি করে নয়। এই বৈষম্য মেধাবী শিশুদের মনে ছোটবেলা থেকেই হীনম্মন্যতা তৈরি করছে।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মিজানুর রহমান সরকার তার বক্তব্যে অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই বৈষম্যের প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার প্রায় ৩০% থেকে ৪০% দায়িত্ব এখন বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনগুলো পালন করছে। তারা সরকারের বোঝা লাঘব করে শিক্ষার বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। অথচ বৃত্তির ক্ষেত্রে তাদের মাত্র ২০% সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা পুরোপুরি অযৌক্তিক। তিনি পরিষ্কার করে বলেন, ২০২৬ সালের এই আধুনিক সময়ে এসে শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারে এমন বিভাজন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। মেধার জয়গান গাইতে হলে সবার জন্য সমান মাঠ তৈরি করতে হবে।

মাঠ পর্যায়ের শিক্ষক প্রতিনিধিরা সম্মেলনে অভিযোগ করেন যে, আগে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক বৃত্তি কোটা চালু ছিল, যা বর্তমানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারের মেধাবী শিশুরা বড় বড় শহরের নামী স্কুলের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। আগে একটি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে অন্তত ১-২ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেত, যা এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। গ্রামীণ শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং প্রান্তিক পর্যায়ের মেধাবীদের উৎসাহিত করতে হলে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক কোটা পদ্ধতি অবিলম্বে পুনর্বহাল করা প্রয়োজন বলে তারা মত দেন।

সম্মেলন থেকে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট ৪ দফা দাবি জানানো হয়েছে। প্রথমত, উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি সকল শিক্ষার্থীর জন্য ১০০% সাম্যভিত্তিক বৃত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে প্রশাসনিক থানাকে একটি করে বৃত্তি ইউনিট হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। তৃতীয়ত, গ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক কোটা আবার চালু করতে হবে। এবং চতুর্থত, শিক্ষার মান উন্নয়নে বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদেরও সরকারি বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব ফারুক হোসেনের সভাপতিত্বে এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন রেহানা আখতার। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল মাজেদ, জেসমিন নাহার এবং সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ হামিদুর রহমান। বক্তারা প্রত্যেকেই শিক্ষাক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ বৈষম্য নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা মনে করেন, দেশের প্রতিটি শিশু রাষ্ট্রের সম্পদ এবং তাদের সমান সুযোগ দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে জানানো হয়, যদি আগামী শিক্ষাবর্ষের আগেই এই বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা সংশোধন করা না হয়, তবে তারা বৃহত্তর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন। কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকরা জানান, তারা শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, তবে শিশুদের অধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না। সম্মেলন শেষে প্রতিনিধিরা নিজ নিজ জেলায় ফিরে গিয়ে এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে জনমত গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সাধারণ অভিভাবকরাও শিক্ষকদের এই যৌক্তিক দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন বলে সম্মেলনে জানানো হয়।

পরিশেষে, বক্তারা আশা প্রকাশ করেন যে বর্তমান সরকার শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এই বৈষম্যগুলো দূর করবে। শিশুদের মেধার সঠিক মূল্যায়নই আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার মূল চাবিকাঠি। তাই দ্রুত একটি মেধাভিত্তিক ও ন্যায়সঙ্গত বৃত্তি ব্যবস্থা চালু হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সারা দেশের লাখ লাখ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী।

সম্পর্কিত নিবন্ধ