নাদপাড়া দাখিল মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মোতাহার হোসেনের ইন্তেকাল: শোকাতুর শিক্ষাঙ্গন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নাদপাড়া দাখিল মাদ্রাসার প্রবীণ ও অত্যন্ত জনপ্রিয় সিনিয়র শিক্ষক মোতাহার হোসেন আর আমাদের মাঝে নেই। আজ ১ আগস্ট ২০২৬, শনিবার ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে তিনি নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। পরিবার ও সহকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, তাঁর মৃত্যুর মূল কারণ ছিল আকস্মিক স্ট্রোক। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৫৫ বছর। তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণে নাদপাড়া এলাকা এবং সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুতে এলাকায় এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

মোতাহার হোসেন দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর ধরে নাদপাড়া দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে আসছিলেন। তিনি কেবল একজন সাধারণ শিক্ষক ছিলেন না, বরং শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন বাবার মতো একজন অভিভাবক। তাঁর পাঠদানের ভঙ্গি এবং অমায়িক ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মুগ্ধ করত। মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক জানান, মোতাহার সাহেব সবসময় ১০০% নিষ্ঠার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করতেন। কোনোদিন অসুস্থতা ছাড়া তিনি স্কুল কামাই করেননি। এমনকি গত সপ্তাহেও তিনি নিয়মিত ক্লাস নিয়েছেন এবং শিক্ষার্থীদের আগামী পরীক্ষার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর এই দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন, যারা আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন।

চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশে স্ট্রোক বর্তমানে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০% মানুষ বিভিন্ন ধরনের স্নায়বিক ও হৃদরোগের কারণে স্ট্রোকের শিকার হন। উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক চাপের কারণে এই ঝুঁকি আরও ৫০% বেড়ে যায়। মোতাহার হোসেনও গত কয়েকদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন বলে তাঁর পারিবারিকভাবে জানা গেছে। ভোর রাত ৩টার দিকে তিনি প্রথম অসুস্থতা অনুভব করেন এবং ঠিক ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে সব মায়া ত্যাগ করে পরপালে চলে যান। তাঁর এই চলে যাওয়া আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাস্থ্য সচেতনতা কতটা জরুরি।

বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষকদের জীবন সংগ্রাম এবং ত্যাগের গল্পগুলো সবসময় আড়ালেই থেকে যায়। অর্থনৈতিকভাবে অনেক সময় তাঁরা বেশ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বেসরকারি মাদ্রাসার একজন সিনিয়র শিক্ষকের মাসিক বেতন ৩৫০ ডলার বা ৪০,০০০ টাকার বেশি হয় না। এত অল্প আয়েও মোতাহার হোসেন নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি সবসময় বলতেন, “মানুষ গড়ার কারিগর হওয়াটাই বড় প্রাপ্তি, টাকা নয়।” তাঁর এই ত্যাগী মনোভাবই তাঁকে সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছিল। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ আজ তাঁর বাড়িতে ভিড় করছেন তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে।

মাদ্রাসার বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁদের প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছেন। দশম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে, “স্যার আমাদের শুধু বইয়ের পড়া পড়াতেন না, বরং জীবনের পাঠ দিতেন। গতকালও তিনি আমাকে ক্লাসে পড়া না পারার জন্য বকা দিয়েছিলেন, আর আজ তিনি নেই—এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।” মোতাহার হোসেনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অনেকেই কাজ ফেলে রেখে তাঁর জানাজায় শরিক হতে আসছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ বাদ জোহর স্থানীয় ঈদগাহ ময়দানে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাঁকে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর সন্তানরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং বাবার আদর্শকে ধারণ করেই বড় হচ্ছেন। মোতাহার হোসেনের মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং এটি পুরো জাতির জন্য এক বড় ধরনের মেধাশূন্যতা। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ