মো. আল আমিন, দীঘিনালা,
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক কাজেও সব সময় এগিয়ে আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এরই ধারাবাহিকতায় ক্যান্সারে আক্রান্ত এক অসহায় ব্যক্তির চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে এগিয়ে এসেছে দীঘিনালা জোন। মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে লড়াই করা জ্যোতি লাল চাকমার হাতে চিকিৎসার জন্য আর্থিক অনুদান তুলে দিয়ে মানবতার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ০৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। সোমবার (২৮ জুলাই) দুপুরে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সহায়তা প্রদান করা হয়।
দীঘিনালার ২ নম্বর বোয়ালখালী ইউনিয়নের থানাপাড়া এলাকার বাসিন্দা জ্যোতি লাল চাকমা দীর্ঘ দিন ধরে এই মরণব্যাধির সাথে লড়াই করছেন। দিন যত যাচ্ছে, তার শারীরিক অবস্থার যেমন অবনতি হচ্ছে, তেমনি চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ এতটাই বেশি যে, একটি মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে তা বহন করা প্রায় ১০০% অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। জ্যোতি লালের পরিবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে তারা ধারদেনা করে প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। ঠিক এই কঠিন সময়ে দেবদূতের মতো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিল দীঘিনালা জোন।
দীঘিনালা জোনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল আমিন, এসইউপি, পিএসসি-এর বিশেষ নির্দেশনায় এই মানবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। জোনের পক্ষ থেকে জ্যোতি লাল চাকমার হাতে নগদ ২০,০০০ (বিশ হাজার) টাকা তুলে দেওয়া হয়। যদিও ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসার তুলনায় এই টাকা হয়তো সামান্য, কিন্তু পাহাড়ি এলাকার একজন সাধারণ মানুষের কাছে এটি অনেক বড় একটি পাওয়া। এই ২০,০০০ টাকা দিয়ে তিনি অন্তত তার পরবর্তী কয়েক মাসের প্রয়োজনীয় ওষুধ বা যাতায়াত খরচ মেটাতে পারবেন। সেনাবাহিনীর এই তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সেনাবাহিনী কেবল দেশের সীমান্ত রক্ষা বা শান্তি বজায় রাখার কাজই করে না, বরং পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও তারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। দীঘিনালা জোনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে তারা সব সময় স্থানীয়দের পাশে থাকে। প্রতি বছরই তাদের বাজেটের একটি বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ১০% থেকে ১৫% অর্থ স্থানীয় দুস্থ মানুষের চিকিৎসা ও শিক্ষা সহায়তায় ব্যয় করা হয়। পাহাড়ি ও বাঙালি নির্বিশেষে যে কেউ বিপদে পড়লে সেনাবাহিনী সেখানে সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। জ্যোতি লাল চাকমার এই ঘটনাটি সেনাবাহিনীর সেই নিয়মিত মানবিক কাজেরই একটি অংশ।
আর্থিক সহায়তা পাওয়ার পর আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন জ্যোতি লাল চাকমা। তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, “আমি কোনোদিন ভাবিনি সেনাবাহিনী নিজে থেকে আমার কষ্টের কথা শুনবে এবং এভাবে সাহায্য করবে। এই ২০,০০০ টাকা আমার কাছে শুধু টাকা নয়, এটি বেঁচে থাকার নতুন একটি আশা।” তার পরিবারের সদস্যরাও সেনাবাহিনীর এই মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, সরকারি বা বেসরকারি অন্য সব প্রতিষ্ঠান যদি এভাবে অন্তত ৫% করেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে কোনো গরিব মানুষকে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে না।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সংকট প্রকট। উন্নত চিকিৎসার জন্য এখানকার মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জেলা শহর বা চট্টগ্রামে যেতে হয়। এতে করে চিকিৎসার মোট খরচের প্রায় ৩০% থেকে ৪০% ব্যয় হয় শুধু যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক কাজে। এই বাড়তি খরচের বোঝা বইতে গিয়ে অনেক পরিবারই চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করে দেয়। সেনাবাহিনী এই বাস্তবতাকে অনুধাবন করে মাঝেমধ্যেই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প এবং নগদ আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে মানুষের কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করে। দীঘিনালা জোনের এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো পাহাড়ের মানুষের মনে সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের উচিত সেনাবাহিনীর মতো এমন মানবিক কাজে এগিয়ে আসা। যদি দেশের ১% ধনী মানুষও নিজ নিজ এলাকার অসহায়দের পাশে দাঁড়াত, তবে জ্যোতি লাল চাকমার মতো মানুষের জীবন হয়তো আরও সহজ হতো। দীঘিনালা জোনের এই উদ্যোগ কেবল একটি অনুদান নয়, এটি সমাজের প্রতি একটি বার্তা যে মানুষ মানুষের জন্য। সামনের দিনগুলোতেও সেনাবাহিনী এভাবে পাহাড়ের মানুষের প্রতিটি বিপদে-আপদে পাশে থাকবে, এটাই স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা।
















