রাজধানীতে প্রটোকলের দাপট কমছে: ১৮ মন্ত্রীর পুলিশের এসকর্ট প্রত্যাহার, কৃচ্ছ্রসাধনের পথে সরকার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে সাইরেন বাজিয়ে মন্ত্রীদের গাড়িবহরের চলাচলের সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। যানজট নিরসন এবং রাষ্ট্রীয় খরচ কমানোর লক্ষ্যে বড় ধরনের এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন থেকে রাজধানীতে চলাচলের সময় ১৮ জন মন্ত্রীকে আর পুলিশের বিশেষ পাহারা বা ‘এসকর্ট’ সুবিধা দেওয়া হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, মূলত জ্বালানি সাশ্রয় এবং পুলিশের ওপর বাড়তি চাপ কমাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ঢাকার বাইরে রাষ্ট্রীয় সফরে গেলে এই ১৮ মন্ত্রী আগের মতোই প্রয়োজনীয় প্রটোকল ও নিরাপত্তা সুবিধা পাবেন।

প্রশাসনের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে মাত্র ছয়জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং একজন মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা রাজধানীতে এসকর্ট সুবিধা পাবেন। তালিকায় থাকা এই ভাগ্যবান সাতজন হলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। কেন কেবল এই সাতজনকেই বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে পুলিশ স্পষ্ট কিছু না বললেও তারা জানিয়েছে, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ১৮ মন্ত্রীর এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে পুলিশের জনবল ও যানবাহনের ওপর বড় ধরনের স্বস্তি ফিরবে। আগে মন্ত্রীদের প্রটোকল দিতে গিয়ে প্রায় ১২০ জন পুলিশ সদস্যকে সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হতো। এখন সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৭৫% থেকে ৮০% জনবল এখন নিয়মিত জননিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করা যাবে। প্রতিটি এসকর্ট গাড়িতে সাধারণত পাঁচজন করে সশস্ত্র পুলিশ সদস্য থাকেন। এখন এসকর্টের জন্য ব্যবহৃত গাড়ির সংখ্যাও ২৫টি থেকে কমে মাত্র ৭টিতে নেমে এসেছে। এতে করে সরকারি কোষাগারের জ্বালানি খরচ প্রায় ৬০% পর্যন্ত কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হঠাৎ করে কেন এমন কৃচ্ছ্রসাধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই এই প্রটোকল সংস্কৃতিতে বদল আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি নিজের নিরাপত্তা বহর থেকেও পুলিশের দুটি দামি প্রটোকল গাড়ি বাদ দিয়েছেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর মূল নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ)। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর বহরে এখন কেবল চারজন সদস্যের দুটি মোটরসাইকেল পাইলট হিসেবে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর এই মিতব্যয়িতা এবং সাধারণ মানুষের যানজটের ভোগান্তি কমানোর মনোভাব থেকেই অন্য মন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম চালু করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া পূর্ণমন্ত্রী রয়েছেন ২৪ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৩ জন। সব মিলিয়ে ৪৮ সদস্যের এই মন্ত্রিসভার বাইরে আরও ১০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজন মন্ত্রী ও পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ৫৮ জন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে প্রটোকল দিতে গিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি বিশাল অংশ সবসময় রাস্তায় থাকতে হতো। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এই বিশাল বাহিনীর অন্তত ৯০ জন সদস্য এখন থানার নিয়মিত ডিউটি বা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজে ফিরতে পারবেন। এতে রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রটেকশন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে ভিআইপি মুভমেন্টের কারণে সাধারণ মানুষকে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয়। একজন মন্ত্রীর এসকর্ট গাড়ির সাইরেন শুনলে ট্রাফিক পুলিশকে সব রাস্তা বন্ধ করে দিতে হতো। এখন ১৮ জন মন্ত্রীর প্রটোকল কমে যাওয়ায় রাজধানীর রাস্তায় যানজটের ভোগান্তি অন্তত ১০% থেকে ১৫% কমবে বলে ট্রাফিক বিভাগ মনে করছে। এছাড়া এসকর্ট থেকে অবমুক্ত হওয়া গাড়িগুলো এখন টহল পুলিশ বা জরুরি ডিউটিতে ব্যবহার করা যাবে, যা পুলিশের লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়াতে সাহায্য করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সাধারণত বাংলাদেশে ক্ষমতা পাওয়ার পর প্রটোকল বা এসকর্ট নেওয়াকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করা হয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, তারা বিলাসিতার চেয়ে প্রয়োজনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম যখন আকাশচুম্বী এবং ডলারের সংকটের কারণে কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলা হচ্ছে, তখন এমন সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এছাড়া পুলিশের ওপর থেকে প্রটোকলের বোঝা কমিয়ে তাদের মূল পেশাগত কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে, ১৮ মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তটি কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং এটি ভিআইপি কালচার থেকে বেরিয়ে আসার একটি শুভ সূচনা। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে কেনা জ্বালানি যেন মন্ত্রীদের অপ্রয়োজনীয় শো-অফে ব্যয় না হয়, সেই নিশ্চয়তা এই আদেশের মাধ্যমে পাওয়া গেল। ঢাকার রাস্তায় এখন সাইরেনের আওয়াজ কমবে এবং সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তিতে চলতে পারবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার। সরকারের এই মিতব্যয়ী অবস্থান যদি অন্যান্য বিভাগেও ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ