এক হাতে রাইফেল অন্য হাতে কলম: ঝালকাঠির পুলিশ পরিদর্শক আনিছুর রহমানের বহুমুখী প্রতিভা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

আলমগীর শরীফ, ঝালকাঠি: বাংলাদেশ পুলিশে এমন অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা কেবল অপরাধ দমনেই দক্ষ নন, বরং সৃজনশীল কাজের মাধ্যমেও তারা জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। ঝালকাঠি জেলা পুলিশে কর্মরত পুলিশ পরিদর্শক মোঃ আনিছুর রহমান তেমনই একজন মানুষ। তিনি একাধারে একজন চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা এবং অন্যদিকে একজন দরদী হৃদয়ের কবি, গীতিকার, সুরকার ও নাট্যকার। পেশাগত কঠোর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি শিল্পের জগতে যে পদচিহ্ন রেখে চলেছেন, তা সমসাময়িক সময়ে বিরল। ঝালকাঠির সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সহকর্মীদের কাছেও তিনি একজন সদালাপী ও মানবিক মানুষ হিসেবে ১০০% আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

আনিছুর রহমানের জন্ম বরিশাল জেলার চরমোনাই এলাকার রাজারচর গ্রামে। মরহুম মোসলেম আলী হাওলাদারের সাত ছেলে-মেয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে দায়িত্ববোধ ছোটবেলা থেকেই তার রক্তে মিশে ছিল। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই তার ভেতরে সাহিত্যের বীজ বপন হয়। স্থানীয় বিদ্যালয়ের সহপাঠী এবং শিক্ষকরা তার লেখা কবিতা দেখে তাকে আদর করে ‘কবি’ বলে ডাকতেন। সেই ছোট্টবেলার ডাকই আজ তাকে দেশের একজন প্রতিষ্ঠিত গীতিকার ও লেখক হিসেবে গড়ে তুলেছে। তার সৃজনশীল কাজের প্রতি এই নেশা তাকে ১৯৮৯ সালে পুলিশ সদস্য হিসেবে যোগদানের পরও ছেড়ে যায়নি। বরং চাকুরির অবসরে তিনি লিখে চলেছেন অসংখ্য গান, কবিতা, ছড়া ও নাটক।

কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৮৯ সালে তিনি চট্টগ্রামে যোগদান করেন। তবে তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটে ১৯৯২ সালে বরিশাল রেঞ্জ রিজার্ভ পুলিশে বদলি হওয়ার পর। সেখানে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নিজের প্রচেষ্টায় ‘প্রভাতী দেয়াল’ নামে একটি দেয়ালিকা এবং ‘প্রভাতী সাহিত্য ম্যাগাজিন’ প্রকাশ করেন। আনিছুর রহমান নিজে এই প্রকাশনাগুলোর সম্পাদক ছিলেন। তার এই উদ্যোগ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সাহিত্যচর্চার এক নতুন দুয়ার খুলে দেয়। অনেকে মনে করেন, পুলিশ বিভাগের যান্ত্রিক জীবনের মধ্যে এই সাহিত্যচর্চা কর্মীদের মানসিক প্রশান্তি প্রায় ৫০% বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, শৃঙ্খলার মধ্যেও সৃজনশীলতার চর্চা সম্ভব।

আনিছুর রহমানের সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালকটি যুক্ত হয় ২০১০ সালে। সে বছর তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে যান। বিদেশের মাটিতে দেশের হয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি লিখে ফেলেন একটি চমৎকার নাটক— ‘আজ কুসুমের বিয়ে’। এটি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি বিশেষ নাটক। নাটকটি কঙ্গোতে থাকা বিভিন্ন দেশের শান্তিকামী মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। প্রায় শতাধিক মঞ্চে এবং ছোট পর্দায় প্রদর্শিত হওয়ার পর নাটকটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা পায়। কঙ্গোর রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এই নাটকের জন্য তাকে আনুষ্ঠানিক ‘প্রশংসা স্বীকৃতি’ প্রদান করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সক্ষম হন। অনেক নাট্যবোদ্ধা মনে করেন, এই নাটকের আন্তর্জাতিক সাফল্য বাংলাদেশি নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক।

পুলিশের এই গুণী কর্মকর্তা কেবল নাটক নয়, গানের জগতেও রেখেছেন অবিস্মরণীয় অবদান। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাবে কর্মরত থাকাকালীন তিনি র‍্যাব সদস্যদের বীরত্ব ও দেশপ্রেম নিয়ে একটি গান লিখেছিলেন। দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আকাশ মাহমুদের কণ্ঠে গাওয়া সেই গানটি ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এ পর্যন্ত তিনি ১০০টিরও বেশি বাউল, বিচ্ছেদ, দরবারী ও ফোক গান লিখেছেন। তার লেখা গানের সুরে মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক নামী কণ্ঠশিল্পী নিয়মিত গানগুলো পরিবেশন করছেন। আনিছুর রহমানের লেখা গানের কথাগুলো মাটির কাছাকাছি হওয়ায় সাধারণ শ্রোতাদের মনে তা খুব দ্রুত জায়গা করে নেয়। তার ১১টি নাটক ও অসংখ্য ছড়া-কবিতা এখন বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে।

ঝালকাঠিতে কর্মরত থাকাকালীন তিনি সাধারণ মানুষের খুব কাছে গিয়ে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন। থানায় আসা ভুক্তভোগীদের সাথে তার ব্যবহারের নম্রতা দেখে অনেকেই অবাক হন। তিনি মনে করেন, পুলিশের কাজ কেবল আসামী ধরা নয়, বরং অপরাধের কারণ অনুসন্ধান করে মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। তার মানবিক গুণাবলী তাকে কেবল একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে পরিচিত করেছে। সহকর্মীদের মতে, আনিছুর রহমানের মতো সৃজনশীল ও দক্ষ কর্মকর্তাদের কারণে পুলিশ বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। তিনি তার সময়ের প্রায় ৭০% পেশাগত কাজে এবং ৩০% শিল্পচর্চায় ব্যয় করার চেষ্টা করেন।

সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন সম্মাননা পেলেও সাধারণ মানুষের ভালোবাসাকেই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তার জীবন সাধারণত অনেক বেশি চাপের হয়, যেখানে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকে মাত্র ১০% থেকে ১৫%। অথচ এই সীমিত সময়ের মধ্যেই তিনি সংগীত ও সাহিত্যের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে চলেছেন। আনিছুর রহমানের এই দীর্ঘ পথচলা তরুণ পুলিশ সদস্যদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মনের ইচ্ছা থাকলে যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশেও নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করা যায়। বর্তমান সময়ে ঝালকাঠি জেলা পুলিশের এই গর্বিত সদস্য তার লেখনীর মাধ্যমে সমাজের অন্ধকার দূর করতে বদ্ধপরিকর।

পরিশেষে বলা যায়, মোঃ আনিছুর রহমান কেবল একজন পুলিশ পরিদর্শকই নন, তিনি বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির একজন নিরলস সেবক। গান ও নাটকের মাধ্যমে তিনি যে দেশপ্রেমের বার্তা দিচ্ছেন, তা অতুলনীয়। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি যে শিল্পকর্মগুলো রেখে যাচ্ছেন, তার মূল্য হয়তো কয়েক লক্ষ $ (ডলার) দিয়েও পরিমাপ করা সম্ভব নয়। ঝালকাঠির মাটিতে তার কর্মময় দিনগুলো হয়ে থাকুক স্মরণীয়। আনিছুর রহমানের কলম আর হৃদয়ের সুর এভাবে আরও বহুকাল বেঁচে থাকুক বাংলা সাহিত্যের আঙিনায়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ