মোঃ মেহেদী হাসান, সাঘাটা: গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার তেনাচিড়া বিল এখন কেবল একটি জলাভূমি নয়, বরং উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে এক টুকরো প্রশান্তির নাম। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এই বিলটি যখন টইটুম্বুর পানিতে ভরে ওঠে, তখন এর রূপ দেখে যে কেউ বিমোহিত হতে বাধ্য। বিস্তীর্ণ জলরাশি আর তার বুক চিরে চলে যাওয়া নির্মাণাধীন সড়ক মিলিয়ে এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে এখানে। স্থানীয় মানুষ তো বটেই, দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরাও এখন তেনাচিড়া বিলকে ‘মিনি কক্সবাজার’ হিসেবে ডাকছেন। গত কয়েক সপ্তাহে এই এলাকায় পর্যটকদের আনাগোনা প্রায় ৮০% বৃদ্ধি পেয়েছে। বিকেলের মিষ্টি রোদে বিলের পানির ঝিকিমিকি আর শাপলা-পদ্মের সমারোহ যেন পর্যটকদের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়।
সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নে অবস্থিত এই বিলটি প্রতিবছর বর্ষায় নতুন যৌবন ফিরে পায়। এলজিইডির নির্মাণাধীন একটি পিচঢালা পথ এখন বিলের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। রাস্তার অনেক অংশই পানির সামান্য নিচে তলিয়ে থাকায় সেখানে হাঁটলে মনে হয় পানির ওপর দিয়ে হাঁটা হচ্ছে। প্রতিদিন বিকেল ৪টার পর থেকে এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে শুরু করে পার্শ্ববর্তী বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর জেলা থেকেও শত শত তরুণ-তরুণী ও পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ এখানে ছুটে আসছেন। স্থানীয়দের মতে, ছুটির দিনগুলোতে এখানে পর্যটকের সংখ্যা ১০০০ ছাড়িয়ে যায়। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক প্রচারণা ও অবকাঠামো তৈরি করা গেলে এখান থেকে বছরে কয়েক লক্ষ টাকার রাজস্ব আয় সম্ভব।
তেনাচিড়া বিলের প্রধান আকর্ষণ হলো এখানকার শান্ত পরিবেশ এবং আদিগন্ত জলরাশি। পর্যটকরা এখানে এসে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। মাঝিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক ঘণ্টা নৌকা ভ্রমণের জন্য তারা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। ডলারে হিসাব করলে যা প্রায় $২ থেকে $৪ এর মতো। নৌকার মাঝি সাব্বির রহমান বলেন, “আগে আমরা শুধু মাছ ধরতাম, কিন্তু এখন পর্যটক আসায় আমাদের আয় ১০০% বেড়ে গেছে। প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নৌকা চালিয়ে আমরা ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা বাড়তি আয় করতে পারছি।” এই বিলের শাপলা আর লাল পদ্ম পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। অনেকেই নৌকায় চড়ে শাপলা তুলে মোবাইলের ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি করছেন।
গোবিন্দগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক মল্লিকা আক্তার মৌ তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলেন, “ফেসবুক আর ইউটিউবে তেনাচিড়া বিলের ভিডিও দেখে আসার ইচ্ছে হয়েছিল। আজ সশরীরে এসে দেখলাম, জায়গাটি ভিডিওর চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। এখানে এলে মন ভালো হয়ে যায়। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময় বিলের পানি যখন লালচে হয়ে ওঠে, তখন মনে হয় যেন আসল কক্সবাজারে আছি।” আরেক দর্শনার্থী জেমি আক্তার জানান, এখানকার নির্মল বাতাস আর গ্রামীণ পরিবেশ শহরের যান্ত্রিকতা ভুলিয়ে দেয়। তবে তিনি মনে করেন, পর্যটকদের বসার জন্য যদি কিছু ছাউনি বা শৌচাগারের ব্যবস্থা থাকতো, তবে নারী ও শিশুদের জন্য আরও সুবিধা হতো।
তেনাচিড়া বিলের এই জনপ্রিয়তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ। ঘুড়িদহ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমান বলেন, “প্রকৃতি আমাদের দুহাত ভরে দিয়েছে। তেনাচিড়া বিলের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ধরে রাখতে হবে। যদি এখানে যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, তবে এলাকার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। আমাদের দাবি, সরকার যেন এই বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে।” এছাড়া এলাকার ২৫% বেকার যুবক এখন এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট দোকান ও ভ্রাম্যমাণ খাবারের স্টল দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে তেনাচিড়া বিলের পরিচিতি এখন তুঙ্গে। রংপুর থেকে আসা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আশিক মাহমুদ বলেন, “আমি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াই, কিন্তু তেনাচিড়া বিলের মতো এমন শান্ত ও স্নিগ্ধ জায়গা খুব কম দেখেছি। এখানে ড্রোন দিয়ে শট নিলে মনে হয় এটি বিদেশের কোনো পর্যটন কেন্দ্র। ডিজিটাল বাংলাদেশে এ ধরনের জায়গার প্রচার বেশি হওয়া দরকার।” ঘুড়িদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম আহম্মেদ তুলিপ জানান, পরিষদের পক্ষ থেকে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে তারা সজাগ আছেন। পর্যটকরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আসাদুজ্জামান জানান, এ বছর বৃষ্টির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫% বেশি হওয়ায় বিলে পানির পরিমাণও বেশি। ফলে বিলের সৌন্দর্য এবার অন্য বছরের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বিলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সড়কের কিছু অংশ পানিতে ডুবে যাওয়ায় পর্যটকরা সেখানে হাঁটতে বেশি পছন্দ করছেন। তবে তিনি পর্যটকদের সতর্ক করে বলেন, পানির নিচে পিচ্ছিল রাস্তা থাকায় সাবধানে চলাচল করা উচিত যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। তিনি আরও মনে করেন, এই বিলের ইকো-সিস্টেম বজায় রাখা জরুরি, যাতে পর্যটন আর প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।
তেনাচিড়া বিল এখন কেবল সাঘাটার নয়, বরং পুরো উত্তরবঙ্গের একটি গর্বের স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে এটি দেশের অন্যতম শীর্ষ পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠবে। পর্যটন মৌসুমে এখানে কয়েক কোটি টাকার লেনদেনের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুতই এখানে আধুনিক পর্যটন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। প্রকৃতির এই দানকে সংরক্ষণ করে আগামীর প্রজন্মের কাছে এক টুকরো নির্মল পৃথিবী উপহার দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন সাঘাটাবাসী। তেনাচিড়া বিলের এই পানির ঢেউ আর শাপলার হাসি যেন এভাবেই যুগ যুগ ধরে পর্যটকদের মনে আনন্দ জুগিয়ে যায়।
















