আব্দুল্লাহ আল মামুন, হরিণাকুণ্ডু: ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় মাদকের মরণনেশা রুখতে প্রশাসন এখন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবয়সীদের মধ্যে মাদকের বিস্তার রোধে নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে গত রবিবার এক ঝটিকা অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। এই অভিযানে মাদক সেবন ও সঙ্গে রাখার অপরাধে একজনকে হাতেনাতে ধরে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের কারবার যখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন হরিণাকুণ্ডুর এই তৎপরতা সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সমাজ থেকে মাদককে ১০০% নির্মূল না করা পর্যন্ত তাদের এই লড়াই চলবে।
গত ২৬শে জুলাই রবিবার উপজেলার শীতলি এলাকায় এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর আসে যে, শীতলি গ্রামের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) প্রদীপ্ত রায় দীপন নিজেই অভিযানে নেতৃত্ব দেন। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শীতলি গ্রামের খালপাড়ার বাসিন্দা মৃত বা জীবিত মোঃ ওয়ারেশ মন্ডলের ৪৬ বছর বয়সী ছেলে মোঃ জাহাঙ্গীর মন্ডল দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযানের সময় তাকে আটক করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
আদালতের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, জাহাঙ্গীর মন্ডলকে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(৫) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। বিচারক তাকে ৩০ দিনের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০০ টাকা অর্থদণ্ডও প্রদান করেন। যদিও ১০০ টাকা অর্থদণ্ড বর্তমান বাজারমূল্যে মাত্র $০.৮৫ (পঁচাশিতে সেন্টের) মতো, তবুও এই শাস্তির মূল উদ্দেশ্য হলো অপরাধীকে সংশোধন করা এবং সমাজের অন্যদের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ঝিনাইদহ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রসিকিউটর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তারা জাহাঙ্গীর মন্ডলের কাছে থাকা নিষিদ্ধ দ্রব্যের নমুনা পরীক্ষা করে আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করেন।
হরিণাকুণ্ডুর স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মাদকাসক্তির কারণে এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রায় ১৫% থেকে ২০% নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একজন কর্মক্ষম মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে কেবল তার পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং পুরো সমাজ একটি দক্ষ শ্রমিক হারায়। ৪৬ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর মন্ডল যখন তার পরিবারের হাল ধরার কথা ছিল, তখন তিনি মাদকের নেশায় মত্ত হয়ে শ্রীঘরে গেলেন। স্থানীয় সমাজকর্মীরা বলছেন, শীতলি খালপাড়ার মতো নির্জন জায়গাগুলো মাদকসেবীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। প্রশাসনের এই অভিযানের ফলে ঐ এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা অন্তত ৫০% কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রদীপ্ত রায় দীপন এই দণ্ডের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মাদক কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। যারা মাদকের সাথে যুক্ত, তাদের জন্য জেলখানা অপেক্ষা করছে। আমরা চাই একটি সুস্থ ও সবল প্রজন্ম গড়ে তুলতে। এই অভিযানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও তথ্য দেওয়া আমাদের কাজকে সহজ করে দিয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, জরিমানার পরিমাণ কম হলেও কারাদণ্ডের বিষয়টি অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করবে। ভবিষ্যতে এমন অভিযান আরও বৃদ্ধি করা হবে এবং কোনো প্রভাবশালী মহলের তদবির এই প্রক্রিয়ায় বাধা হতে পারবে না।
শীতলি গ্রামের সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ এই সিদ্ধান্তে খুশি। এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, নেশার টাকার জন্য অনেক সময় ছোটখাটো চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে। অপরাধীদের দমনে আইনের এই প্রয়োগ খুবই জরুরি ছিল। পরিসংখ্যান বলছে, ঝিনাইদহ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ার কারণে মাদকের সরবরাহ এখানে একটু বেশি। তবে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে গত কয়েক মাসে মাদকের সরবরাহ ও ব্যবহার প্রায় ৩০% হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং মাদকের কুফল প্রচার করতে স্থানীয় প্রশাসন ও এনজিওগুলো একসাথে কাজ করছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রসিকিউটর জানান, ২০১৮ সালের আইনে মাদকাসক্তদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। জাহাঙ্গীর মন্ডলের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অপরাধ বিবেচনা করে এক মাসের সাজা দেওয়া হয়েছে, তবে একই অপরাধ বারবার করলে শাস্তির পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শীতলি গ্রামের পাশাপাশি হরিণাকুণ্ডুর অন্যান্য ইউনিয়নগুলোতেও একইভাবে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করছে যাতে মাদকের বড় ডিলারদেরও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়।
পরিশেষে, হরিণাকুণ্ডুর এই মাদকবিরোধী অভিযান কেবল একজনের শাস্তি নয়, বরং পুরো উপজেলার মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য একটি লাল সংকেত। সমাজ থেকে অন্ধকার দূর করতে হলে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি যারা এই ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের কঠিনতম শাস্তির দাবি উঠছে সব মহল থেকে। জাহাঙ্গীর মন্ডলের এই এক মাসের কারাদণ্ড অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে এবং হরিণাকুণ্ডু অদূর ভবিষ্যতে ১০০% মাদকমুক্ত একটি জনপদ হিসেবে পরিচিতি পাবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
















