শৈলকুপায় গভীর রাতে ডাকাতির প্রস্তুতি: দুই তরুণ গ্রেফতার ও মাদক আইনে সাজা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

শৈলকুপা, ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় অপরাধ দমনে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গভীর রাতে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে দুই তরুণকে গ্রেফতার করেছে শৈলকুপা থানা পুলিশ। গত ২৬শে জুলাই ২০২৬ তারিখ দিবাগত রাতে উপজেলার ধাওড়া গ্রাম থেকে তাদের আটক করা হয়। গ্রেফতারকৃত এই দুই তরুণের বিরুদ্ধে কেবল ডাকাতির চেষ্টার অভিযোগই নয়, বরং মাদক সেবনের প্রমাণ পাওয়ায় দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় তাদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এই ঘটনা এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এবং স্থানীয়রা পুলিশের এই তৎপরতাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওইদিন রাত ২৩.৩৫ ঘটিকার সময় শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লার নির্দেশে পুলিশের একটি চৌকস দল এলাকায় নিয়মিত টহল দিচ্ছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে যে, ধাওড়া দাখিল মাদ্রাসার সামনে একদল যুবক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ডাকাতির উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছে। খবর পাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পুলিশ সদস্যরা সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলেও ধাওয়া করে দুইজনকে ধরে ফেলে ফোর্স। আটককৃতরা হলেন— ধাওড়া গ্রামের মোঃ সেলিম জোয়ার্দ্দারের ছেলে মোঃ রাসেল জোয়ার্দ্দার (১৯) এবং একই গ্রামের মোঃ আলীম মোল্লার ছেলে আসিফ মোল্লা (২০)।

আটক করার সময় তাদের আচার-আচরণ ও কথাবার্তায় পুলিশের সন্দেহ হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ওই এলাকায় ডাকাতির পরিকল্পনা করার কথা স্বীকার করলেও তাদের শারীরিক অবস্থা দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে তারা নেশাগ্রস্ত। পরে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায় যে, তারা নিয়মিত মাদক সেবন করে এবং অপরাধ ঘটানোর আগেও মাদক গ্রহণ করেছিল। পুলিশ জানায়, বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ার পেছনে মাদকের ভূমিকা প্রায় ৮০% এর বেশি। ধৃত আসামীরা উঠতি বয়সী হওয়ায় তাদের এই বিপথে যাওয়া নিয়ে এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মাদক সেবনের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশ আসামীদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(৫) ধারায় মামলা রুজু করে এবং দ্রুত তাদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করে। আদালত মামলার শুনানি শেষে উভয় আসামীকে ০৩ (তিন) মাসের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। এছাড়া প্রত্যেককে ১০০০/- (এক হাজার) টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। যদি তারা এই ১০০০/- টাকা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের আরও ১৫ দিনের অতিরিক্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। বর্তমান বাজারদরে ১০০০ টাকা হয়তো খুব বেশি নয়, যা ডলারে রূপান্তর করলে মাত্র $৮.৫ বা $৯ এর মতো হতে পারে, কিন্তু আইনি কঠোরতা এবং কারাদণ্ডের বিষয়টি অপরাধীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছে সুশীল সমাজ।

তবে কেবল মাদক সেবনের সাজাতেই পার পাচ্ছেন না এই দুই যুবক। পুলিশ জানিয়েছে, ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওই মামলায় তাদের রিমান্ডে নিয়ে আরও তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হতে পারে। শৈলকুপা থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এই চক্রটির সাথে আর কেউ জড়িত আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ধাওড়া এবং আশেপাশের এলাকায় গত কয়েক মাসে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই গ্রেফতারের ফলে অপরাধের হার কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা এই সফল অভিযানের বিষয়ে বলেন, “আমরা মাদকের বিরুদ্ধে ১০০% জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছি। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমাদের টিম সফলভাবে এই দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। তারা ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যা বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারত। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে আমাদের এই অভিযান আগামী দিনগুলোতে আরও জোরদার করা হবে।” তিনি সাধারণ মানুষকে সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই পুলিশকে খবর দেওয়ার অনুরোধ জানান।

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, ধাওড়া দাখিল মাদ্রাসার সামনের নির্জন এলাকাটি রাতের বেলা অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “রাত ১০টার পর এই রাস্তা দিয়ে চলতে ভয় লাগে। অল্প বয়সী ছেলেরা দল বেঁধে আড্ডা দেয় এবং নেশা করে। পুলিশের এই অভিযানের ফলে আমরা একটু স্বস্তি পেলাম। আমরা চাই সাজাপ্রাপ্তরা জেল থেকে ফিরে যেন আর এই পথে না যায়।” মাদক সেবনের পাশাপাশি ডাকাতির মতো অপরাধে জড়ানো এই তরুণদের ভবিষ্যত নিয়ে তাদের পরিবারও এখন চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, শৈলকুপা পুলিশের এই ত্বরিত পদক্ষেপ কেবল দুই অপরাধীকে আইনের আওতায় আনেনি, বরং অপরাধ জগতের সাথে জড়িত অন্যান্যদের জন্যও একটি কড়া হুঁশিয়ারি সংকেত দিয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দ্রুত সাজা প্রদানের বিষয়টি বিচার ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াবে। তবে সমাজের ১০% অপরাধীও যদি সংশোধন হয়, তবে এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা পুলিশের জন্য অনেক সহজ হবে। পুলিশ প্রশাসন এবং জনসাধারণের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে শৈলকুপাকে একটি নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ