স্মার্টফোনে জুয়ার মরণনেশা: শৈলকুপায় অনলাইন জুয়াড়ি মিথুনকে হাতেনাতে ধরল পুলিশ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানা এলাকায় অনলাইন জুয়ার বিস্তার রোধে পুলিশ কঠোর অভিযান শুরু করেছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখ শৈলকুপা থানার পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে মোঃ মিথুন (৩৫) নামে এক অনলাইন জুয়াড়িকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃত মিথুন শৈলকুপা উপজেলার কবিরপুর গ্রামের মৃত আব্দুল ওহাবের ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে যে কবিরপুর এলাকায় মোবাইলের মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জুয়া খেলা চলছে। এই খবরের সত্যতা যাচাই করতে থানার অফিসার ফোর্স দ্রুত অভিযানে নামে এবং জুয়া খেলারত অবস্থায় মিথুনকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা নিজে এই অভিযানের তদারকি করেন।

বর্তমানে আমাদের সমাজে অনলাইন জুয়া একটি মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবয়সী মানুষদের মধ্যে প্রায় ৮০% স্মার্টফোন ব্যবহারকারী কোনো না কোনোভাবে এই ডিজিটাল নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। আগেকার দিনে মানুষ সামনাসামনি তাস বা লুডু দিয়ে জুয়া খেলত, কিন্তু এখন সময় বদলেছে। এখন হাতে থাকা মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই বিদেশে থাকা বিভিন্ন সার্ভারে টাকা পাঠিয়ে বাজি ধরা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মিথুন দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন নিষিদ্ধ অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে জুয়া খেলছিল। এই জুয়ার পেছনে সে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ২০০ ডলার ($) সমপরিমাণ টাকা নষ্ট করছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এই টাকা সে অবৈধ পথে সংগ্রহ করত নাকি পরিবারের সঞ্চয় থেকে খরচ করত, পুলিশ এখন তা খতিয়ে দেখছে।

শৈলকুপা থানার এই অভিযানটি ছিল অত্যন্ত ঝটিকা ও কৌশলী। ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে পুলিশ যখন কবিরপুর এলাকায় পৌঁছায়, তখন মিথুন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ফোনে জুয়া খেলছিল। সে ভাবতেও পারেনি যে পুলিশ তাকে ডিজিটাল মাধ্যমে এই অপরাধ করার সময় ধরে ফেলবে। পুলিশ তার কাছ থেকে অপরাধে ব্যবহৃত স্মার্টফোনটি জব্দ করেছে। এই ফোনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জুয়ার সাইটের অ্যাকাউন্ট লগ-ইন করা ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, আসামীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এই ধরণের অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ এখন থেকে ০% (শূন্য শতাংশ) ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

অনলাইন জুয়ার এই কারবার শুধু শৈলকুপায় নয়, সারা দেশেই এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, গ্রামের সাধারণ মানুষ সহজ উপায়ে বড়লোক হওয়ার লোভে পড়ে তাদের শেষ সম্বলটুকুও এই জুয়ার পেছনে হারায়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অনলাইনে জুয়া খেলে জেতার সম্ভাবনা মাত্র ৫% থেকে ১০%, অথচ হারার সম্ভাবনা থাকে ১০০%। তবুও মানুষ এই মরণনেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। মিথুনকে গ্রেফতারের পর এলাকার অনেক সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। কবিরপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই অনলাইন জুয়ার কারণে এলাকায় ছোটখাটো চুরি এবং পারিবারিক অশান্তি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পুলিশের এই তৎপরতা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

অফিসার ইনচার্জ মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা এই বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা কোনোভাবেই শৈলকুপার মাটিতে মাদক বা জুয়াকে প্রশ্রয় দেব না। আসামী মিথুন অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে শুধু নিজের ক্ষতিই করেনি, বরং সমাজের অন্যদেরও এই পথে উৎসাহিত করছিল। আমরা তার ফোনের তথ্য যাচাই করে এই চক্রের সাথে জড়িত আরও ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।” পুলিশ আরও জানায় যে, বর্তমানে অনলাইন জুয়াড়িরা বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিদেশের জুয়ার সাইটে টাকা পাঠাচ্ছে। এতে দেশের প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যাচ্ছে। শৈলকুপা থানা পুলিশ এখন থেকে নিয়মিত সাইবার মনিটরিং করবে যাতে কেউ ইন্টারনেটে বসে এরকম অপরাধ করতে না পারে।

ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে যারা অপরাধের স্বর্গরাজ্য গড়তে চায়, তাদের বিরুদ্ধে শৈলকুপা পুলিশ এখন রণক্ষেত্রে। পুলিশের এই অভিযানে শুধু একজন মিথুন গ্রেফতার হয়নি, বরং পুরো জুয়াড়ি চক্রের কাছে একটি কড়া বার্তা পৌঁছে গেছে। সমাজের সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, শুধু পুলিশ দিয়ে এই সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য পরিবারকেও এগিয়ে আসতে হবে। সন্তান বা পরিবারের কোনো সদস্য দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোনে কী করছে, সেদিকে নজর রাখা ১০০% জরুরি। মিথুনের মতো ব্যক্তিরা যখন ধরা পড়ে, তখন তাদের পরিবারের ওপর দিয়ে বড় ঝড় বয়ে যায়। তাই সময় থাকতেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

২৪ জুলাইয়ের এই অভিযানে পুলিশের যে পেশাদারিত্ব দেখা গেছে, তা সাধারণ মানুষের মনে আস্থা বাড়িয়েছে। গ্রেফতারকৃত মিথুনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করার পর তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা শৈলকুপাকে একটি মডেল উপজেলা হিসেবে গড়তে চান, যেখানে কোনো জুয়া, মাদক বা ইভটিজিং থাকবে না। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি তারা এখন সাইবার অপরাধ দমনে বিশেষ ইউনিট গঠন করার পরিকল্পনা করছেন। সাধারণ মানুষ যেন নির্ভয়ে অপরাধীদের তথ্য পুলিশকে দিতে পারে, সেজন্য থানা থেকে বিশেষ হেল্পলাইন চালু রাখা হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লার নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানটি অনলাইন জুয়াড়িদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। মিথুনের গ্রেফতার হওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল অপরাধ করলেও পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শৈলকুপা থেকে এই ধরণের সামাজিক ব্যাধি অচিরেই দূর হবে বলে সবাই আশা করছেন। সামনের দিনগুলোতে শৈলকুপা থানা পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযান আরও জোরালো হবে এবং অপরাধীরা কোনোভাবেই রক্ষা পাবে না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ