শৈলকুপায় পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান: ইয়াবাসহ আটক ৪, দণ্ডিত ৩ ও অনলাইন জুয়াড়ি গ্রেফতার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানা এলাকায় গত কয়েকদিনে মাদক ও অপরাধ দমনে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছে পুলিশ। অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লার সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। একই সাথে মাদক সেবন, ব্যবসা এবং অনলাইন জুয়া খেলার সাথে জড়িত থাকার অপরাধে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। পুলিশি এই সাঁড়াশি অভিযানে এলাকার সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরেছে। একদিনের অভিযানে পুলিশ মোট ২৭১ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে এবং বিভিন্ন মেয়াদে মাদকসেবীদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

গত ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখ রাত ২টা ৩০ মিনিটের দিকে শৈলকুপা থানার একটি চৌকস দল বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে সাধুহাটি গ্রামের মোঃ সৌরভ হোসেনের ছেলে মোঃ আল মামুন (২২) এবং বকশিপুর গ্রামের মোঃ লিয়াকত বিশ্বাসের ছেলে মোঃ কাজল হোসেন বিশ্বাসকে (৩৩) মাদক সেবনরত অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(৫) ধারায় মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করে। বিজ্ঞ আদালত সকল তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে আসামীদ্বয়কে ০২ মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। পুলিশের এই তৎপরতায় স্থানীয় মাদকসেবীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখ রাতে চন্ডিপুর হাইওয়ে রোডের ব্রিজের ওপর থেকে বড় ধরনের একটি মাদকের চালান জব্দ করে পুলিশ। রাত ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে অবস্থান নেয়। এসময় গাড়াখোলা গ্রামের মৃত মান্নান মন্ডলের ছেলে মোঃ আশিক মন্ডলকে (৩৩) সন্দেহভাজন হিসেবে তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিকালে তার কাছ থেকে ৩০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। একই দিন পৃথক অভিযানে চন্ডিপুর গ্রাম থেকে অমিত কুমার দাস নামে এক মাদকসেবীকে গ্রেফতার করা হয়। অমিতের মাদক সেবনের বিষয়টি হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ায় উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মাহফুজুর রহমান তাকে ০১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।

শৈলকুপা থানার এই বিশেষ অভিযানে শুধু মাদকই নয়, অপরাধের অন্যান্য শাখাতেও আঘাত হেনেছে পুলিশ। ২৪ জুলাই সন্ধ্যা ৭টা ও রাত ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে পরিচালিত অভিযানে আরও ৬৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এসব মাদক ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ইয়াবা সরবরাহ করে আসছিল। তাদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই দিন শৈলকুপার কবিরপুর এলাকা থেকে মোঃ মিথুন (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে অনলাইন জুয়া খেলার সময় গ্রেফতার করা হয়। মৃত আব্দুল ওহাবের ছেলে মিথুন অনলাইনে বিভিন্ন নিষিদ্ধ সাইটে জুয়া খেলে যুবসমাজকে বিপথে চালিত করছিল। তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দিয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে ২৫ জুলাই রাত ৯টা ৫ মিনিটের দিকে। শৈলকুপা থানাধীন আসাননগর গ্রামের একটি টাওয়ার সংলগ্ন চা দোকানের সামনে পুলিশ নিয়মিত মোটরসাইকেল তল্লাশি শুরু করে। এসময় একটি সন্দেহভাজন মোটরসাইকেলকে থামার সংকেত দিলে চালক পুলিশ দেখে দ্রুত গাড়িটি ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ধাওয়া করেও অজ্ঞাতনামা সেই ব্যক্তিকে ধরতে পারেনি। তবে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে পরিত্যক্ত মোটরসাইকেলটি তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিকালে মোটরসাইকেলের বিশেষ চেম্বার থেকে ১৭৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া মোটরসাইকেল থেকে একটি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনায় পালিয়ে যাওয়া আসামিকে শনাক্ত করতে পুলিশ জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।

শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। আমাদের অভিযানে এ পর্যন্ত ১০০% স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে। মাদক ও জুয়া আমাদের সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। বিশেষ করে যুবসমাজের ১০% থেকে ২০% মানুষ যদি এই মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ে, তবে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তাই আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে শৈলকুপাকে অপরাধমুক্ত করার চেষ্টা করছি। অভিযানে জব্দকৃত ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য কয়েক লক্ষ টাকা। পুলিশ মনে করছে, আসাননগর থেকে উদ্ধার হওয়া ১৭৫ পিস ইয়াবার পেছনে কোনো বড় সিন্ডিকেট জড়িত থাকতে পারে।

বর্তমান সময়ে মাদকের পাশাপাশি অনলাইন জুয়া একটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শৈলকুপার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় একদল যুবক মোবাইলের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা লেনদেন করছে। এসব জুয়াড়িদের কারণে পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে এবং অনেকে ঋণের দায়ে জড়িয়ে পড়ছে। মোঃ মিথুন (৩৫) পিতা-মৃত আব্দুল ওহাব, সাং-কবিরপুর,শৈলকুপা কে আটক পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা এসব অনলাইন অ্যাপস বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জুয়া পরিচালনা করছে, তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে অনলাইন জুয়াড়িদের ধরতে পুলিশের এই অভিযান আরও কঠোর হবে।

পুলিশের এই নিয়মিত অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন শৈলকুপার সাধারণ মানুষ। তাদের মতে, নিয়মিত চেকপোস্ট এবং টহল থাকার কারণে অপরাধীরা এখন অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আসাননগরে পরিত্যক্ত অবস্থায় মোটরসাইকেল থেকে ইয়াবা উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা পুলিশের ভয়ে এখন অস্থির। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের সহযোগিতা এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে তারা দ্রুত যে কোনো অপরাধ দমন করতে সক্ষম। শৈলকুপাকে একটি আদর্শ ও নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে পুলিশের এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ