নরসিংদীর রায়পুরায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে যা পুরো জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মানুষের জীবন বাঁচানোর কারিগর হিসেবে পরিচিত একজন সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার যখন নিজেই মরণ নেশা ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন, তখন সাধারণ মানুষের স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। গত শুক্রবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রাজিবকে ৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করেছে রায়পুরা থানা পুলিশ। একজন প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার এমন পতন এলাকার সচেতন মহলের মধ্যে ৯৫% ক্ষোভ ও বিস্ময় তৈরি করেছে। রাত ১০টার দিকে রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান সাংবাদিকদের এই গ্রেপ্তারের খবর নিশ্চিত করেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, ডা. রাজিব দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবার নেশায় আসক্ত ছিলেন বলে গুঞ্জন ছিল। পুলিশ গত শুক্রবার রাতে খবর পায় যে, একটি নির্দিষ্ট স্থানে মাদকের লেনদেন হতে যাচ্ছে। সেই খবরের ভিত্তিতে রায়পুরা থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল ওত পেতে থাকে এবং রাজিবকে তল্লাশি করে তাঁর কাছ থেকে নিষিদ্ধ ৫০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে। বর্তমান বাজারে এই পরিমাণ ইয়াবার দাম প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকার কাছাকাছি, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় ১৫০ ডলারের ($) সমান। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের পর তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই অভিযানে পুলিশের তৎপরতা ছিল ১০০% নিখুঁত, যার ফলে ডা. রাজিব পালানোর কোনো সুযোগ পাননি।
স্থানীয় সূত্র এবং ডা. রাজিবের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তাঁর এই মাদকাসক্তি আজকের নতুন কোনো ঘটনা নয়। তিনি যে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা হয়ে গেছেন, তা তাঁর পরিবার অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল। বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী ডা. উম্মে হানি স্বামীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। তিনি রাজিবকে একাধিকবার মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র বা রিহ্যাব-এ পাঠিয়েছিলেন যাতে তিনি এই মরণ নেশা ছেড়ে সুস্থ জীবনে ফিরতে পারেন। কিন্তু কোনো চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি। একজন উচ্চ শিক্ষিত চিকিৎসক হয়েও কেন তিনি এই নেশার জালে জড়িয়ে পড়লেন, তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক কানাঘুষা চলছে। স্থানীয়দের দাবি, ডা. রাজিব কেবল সেবন করতেন না, বরং তাঁর মাদক সংশ্লিষ্টতা আরও গভীর হতে পারে।
একজন সরকারি হাসপাতালের আরএমও-র মতো দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন কাজ করাটা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে বড় ধরণের ধাক্কা দিয়েছে। রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা বলছেন, যে ডাক্তার আমাদের সুস্থ করবেন, তিনি নিজেই যদি নেশাগ্রস্ত থাকেন তবে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? এলাকার প্রায় ৮০% মানুষ মনে করেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের আগে এবং চাকরিরত অবস্থায় মাঝে মাঝে ডোপ টেস্ট করা এখন সময়ের দাবি। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির হাতে সরকারি হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গার দায়িত্ব থাকা মোটেও নিরাপদ নয়। এই গ্রেপ্তারের পর ডা. রাজিবের পেশাগত ভবিষ্যৎ এখন বড় ধরণের হুমকির মুখে। সরকারি বিধি অনুযায়ী, তিনি এখন সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার সম্মুখীন এবং আদালত দোষী সাব্যস্ত করলে তাঁর লাইসেন্স পর্যন্ত বাতিল হতে পারে।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। অপরাধী যেই হোক, সে যদি প্রভাবশালী বা সরকারি কর্মকর্তা হয়, তবুও ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা রাজিবের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং তাঁর সাথে আর কারা এই মাদক সিন্ডিকেটে জড়িত আছে তা বের করার চেষ্টা করছি।” পুলিশের এই সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করছেন এলাকার সুশীল সমাজ। তবে তারা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তার করলেই হবে না, মাদকের মূল উৎপাটন করা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষিত যুবসমাজ এবং দায়িত্বশীল পদাধিকারীরা যখন ইয়াবার দিকে ঝুঁকছে, তখন বুঝতে হবে সামাজিক অবক্ষয় কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নরসিংদী জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এই ঘটনায় বেশ বিব্রত। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, ডা. রাজিবের এই কর্মকাণ্ডের জন্য বিভাগীয় তদন্ত শুরু হবে। যদি অভিযোগের সত্যতা আদালতের মাধ্যমেও প্রমাণিত হয়, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে ডা. রাজিবের গ্রেপ্তারের খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তাঁর সহকর্মীদের মধ্যেও অস্বস্তি বিরাজ করছে। অনেকেই বলছেন, তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন কিন্তু ভুল পথে পা বাড়িয়ে নিজের সাথে সাথে পরিবারের সম্মানকেও ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছেন। মাদকের এই মরণ ছোবল যে কাউকে ধ্বংস করে দিতে পারে, ডা. রাজিবের ঘটনাটি তার জীবন্ত উদাহরণ।
বর্তমানে নরসিংদী জেলায় মাদকের সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে বলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ। বিশেষ করে ইয়াবা পাচারের হার গত ছয় মাসে প্রায় ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে যা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। হাইওয়ে রোড এবং নদীপথ ব্যবহার করে এসব মাদক এলাকায় প্রবেশ করে। রাজিবের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন এর ক্রেতা হন, তখন সরবরাহকারীরা আরও উৎসাহিত হয়। সাধারণ মানুষের দাবি, এই ডাক্তারকে কেবল ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের মাঝেই যেন বিচার সীমাবদ্ধ না থাকে। তাঁর পেছনে থাকা বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীদেরও আইনের আওতায় আনা হোক। আজকের এই গ্রেপ্তারের ফলে রায়পুরার সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে।
সবশেষে বলা যায়, ডা. রাজিবের এই গ্রেপ্তার কেবল একটি আইনি ঘটনা নয়, এটি একটি সামাজিক ট্র্যাজেডিও বটে। একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীকে বাঁচাতে রিহ্যাবে পাঠাচ্ছেন, আর সেই স্বামী আবারও নেশায় ফিরে যাচ্ছেন—এই চিত্রটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে হলে কেবল পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতাও ১০/১০ ভাগ প্রয়োজন। ডা. রাজিবের বিচার প্রক্রিয়ার দিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো নরসিংদীবাসী। ইয়াবামুক্ত সমাজ গড়তে হলে অপরাধীদের পরিচয় না দেখে তাদের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রায়পুরার এই ঘটনাটি দেশের অন্যান্য চিকিৎসকদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
















