ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার সাধারণ মানুষের বিনোদন এবং তরুণ সমাজকে মাদকের নীল দংশন থেকে রক্ষা করতে এক অভিনব দাবি তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। উপজেলার সাধারণ বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে মোঃ শাহীন আখন নামে এক যুবক বোরহানউদ্দিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং ভোলা-২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য বরাবর একটি লিখিত আবেদন পেশ করেছেন। গত ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে করা এই আবেদনে বোরহানউদ্দিনের প্রাণকেন্দ্রে সরকারিভাবে একটি ‘পাবলিক জায়ান্ট এলইডি স্ক্রিন’ স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই স্থানীয় তরুণদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবিটি ১০০% জোরালো হয়ে উঠেছে।
আবেদনকারী শাহীন আখন তাঁর আবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, বোরহানউদ্দিন উপজেলার মানুষ খেলাধুলা ও জাতীয় অনুষ্ঠানের প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী। বিশেষ করে যখন ফুটবল বা ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলে, তখন এলাকার মানুষের উন্মাদনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, একসাথে কয়েক হাজার মানুষ বসে বড় পর্দায় খেলা দেখার মতো কোনো সুব্যবস্থা এই উপজেলায় নেই। অথচ উন্নত বিশ্বের শহরগুলোতে তো বটেই, এমনকি দেশের অনেক বড় শহরেও এখন জায়ান্ট স্ক্রিন দেখা যায়। শাহীন মনে করেন, একটি ২০ থেকে ৩০ ফুট আকারের ডিজিটাল স্ক্রিন বসালে বোরহানউদ্দিনের চেহারা বদলে যাবে। এই প্রকল্পে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ ডলার ($) খরচ হতে পারে, যা একটি উপজেলার উন্নয়ন বাজেটের তুলনায় খুব বড় কোনো অঙ্ক নয়।
আবেদনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে যেখানে এই বড় পর্দা বসানো যেতে পারে। জায়গাগুলো হলো উপজেলা শিশু পার্ক, উপজেলা গেটের সামনে, ঐতিহ্যবাহী খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকা, সরকারি হাই স্কুল মাঠ অথবা সরকারি আব্দুর জব্বার কলেজ মাঠের অডিটোরিয়ামের পাশে। শাহীন আখন বিশ্বাস করেন, এর মধ্যে যেকোনো একটি স্থানে স্ক্রিনটি বসালে প্রতিদিন সন্ধ্যায় কয়েকশ মানুষ সেখানে সমবেত হবে। এতে করে মানুষের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ বাড়বে। বর্তমানে মানুষে-মানুষে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটি অন্তত ১০% থেকে ২০% কমিয়ে আনতে এমন উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।
এই দাবির পেছনে সবচেয়ে বড় যে কারণটি কাজ করছে তা হলো তরুণ সমাজকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করা। বোরহানউদ্দিনের সচেতন নাগরিকদের মতে, এলাকার প্রায় ৭০% যুবক অলস সময়ে স্মার্টফোনে আচ্ছন্ন থাকে অথবা আড্ডার ছলে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যদি একটি বড় পর্দায় নিয়মিত খেলাধুলা বা শিক্ষামূলক তথ্য প্রচার করা হয়, তবে তরুণরা মাঠমুখী হবে। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বাড়লে মাদক থেকে দূরে থাকার হার অন্তত ২৫% বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাদক নির্মূলে শুধু আইনের প্রয়োগ যথেষ্ট নয়, বরং তরুণদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ করে দেওয়াও সরকারের দায়িত্ব। এই জায়ান্ট স্ক্রিনটি সেই দায়িত্ব পালনের একটি অন্যতম মাধ্যম হতে পারে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন সরকার দেখছে, সেই অগ্রযাত্রায় বোরহানউদ্দিনকে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে এই স্ক্রিনটি মাইলফলক হতে পারে। শুধু খেলাধুলা নয়, জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ কিংবা সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এই পর্দার মাধ্যমে সবার কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে করে সাধারণ মানুষ ১০/১০ ভাগ সঠিক তথ্য জানতে পারবে এবং গুজব ছড়ানোর সুযোগ থাকবে না। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এভাবে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিলে নাগরিক সচেতনতাও বাড়বে। শাহীন আখনের এই আবেদনটি কেবল একটি দাবি নয়, বরং এটি আধুনিক বোরহানউদ্দিন গড়ার একটি গঠনমূলক প্রস্তাব।
শাহীন আখন তাঁর আবেদনে আরও বলেছেন যে, বোরহানউদ্দিনের মানুষ খেলাধুলার সময় গাদাগাদি করে ছোট ছোট দোকানে ভিড় করে। সেখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু উন্মুক্ত স্থানে একটি বড় পর্দা থাকলে পরিবেশ সুন্দর থাকবে এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন মজবুত হবে। এই উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে জেলার মধ্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইতিমধ্যে বোরহানউদ্দিন পৌরসভার বাসিন্দারা এই দাবির পক্ষে স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করেছেন। ফেসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে এই আবেদনটি প্রচুর লাইক ও শেয়ার পাচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে মানুষ সত্যিই এমন একটি আধুনিক সুযোগ চাচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং সংসদ সদস্যের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে শাহীন আখন বলেন, জনস্বার্থে এই বিষয়টি বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। এলাকার উন্নয়ন মানে কেবল রাস্তাঘাট তৈরি নয়, মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও সুস্থ বিনোদনের পথ তৈরি করাও উন্নয়নেরই অংশ। বোরহানউদ্দিনের কয়েক হাজার ছাত্র ও সাধারণ মানুষ এখন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা আশা করছেন, আগামী ফুটবল বা ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগেই যেন এই জায়ান্ট স্ক্রিনটি বোরহানউদ্দিনের মাটিতে আলোর ছটা ছড়ায়। এটি সম্ভব হলে ভোলা জেলার এই জনপদটি একটি আদর্শ ডিজিটাল উপজেলায় রূপান্তরিত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মোঃ শাহীন আখনের মতো একজন সাধারণ বাসিন্দার এই সময়োপযোগী চিন্তা বোরহানউদ্দিনবাসীকে আশার আলো দেখাচ্ছে। সংসদ সদস্য ও ইউএনও মহোদয় যদি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখেন এবং প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করেন, তবে খুব শীঘ্রই বোরহানউদ্দিনবাসী নতুন এক দিগন্তের সূচনা দেখতে পাবে। মাদকমুক্ত ও আধুনিক বোরহানউদ্দিন গড়তে খেলাধুলা আর বিনোদনের কোনো বিকল্প নেই। ২৫ জুলাইয়ের এই আবেদনটি যেন কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবের রূপ পায়, এখন এটাই সবার প্রত্যাশা। সাধারণ মানুষ এই দাবি আদায়ের জন্য একাত্মতা প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছে।
















