দুর্ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সরকারি অনুদান: আবেদনের নিয়ম ও শর্তাবলি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এক বড় সুখবর নিয়ে এসেছে সরকার। পড়াশোনার পাশাপাশি কোনো শিক্ষার্থী যদি আকস্মিক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়, তবে তাদের চিকিৎসার ভার লাঘব করতে এককালীন আর্থিক অনুদান দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শুরু করে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের সাধারণ এবং কারিগরি শিক্ষার শিক্ষার্থীরা এই সুবিধার আওতায় আসবে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান দুর্ঘটনায় পড়লে অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি ঝরে পড়ে শিক্ষা জীবন থেকেও। এই সংকট কাটাতে ১০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা অনুদান দিচ্ছে রাষ্ট্র। এতে করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর থেকে চিকিৎসার বড় একটি বোঝা নেমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই অনুদান পেতে হলে শিক্ষার্থীদের আগামী ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের মধ্যে আবেদন করতে হবে। আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিক। রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত ওয়েবসাইটের পোর্টাল খোলা থাকবে। এই সহায়তার মূল লক্ষ্য হলো দুর্ঘটনায় আহত মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যেন ব্যাহত না হয় তা নিশ্চিত করা। বর্তমান বাজারে চিকিৎসার ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই অনুদান অনেক পরিবারের জন্য আর্শীবাদ স্বরূপ। ৫০,০০০ টাকা মানে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ ডলারের ($) কাছাকাছি একটি অঙ্ক, যা গ্রামবাংলার একটি সাধারণ পরিবারের জন্য অনেক বড় অবলম্বন। সরকার প্রতি বছরই হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে এই ট্রাস্টের মাধ্যমে বৃত্তি ও সহায়তা প্রদান করে থাকে।

তবে এই অনুদান পেতে হলে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত ও যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। প্রথমত, শিক্ষার্থীকে অবশ্যই মেধাবী হতে হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী পরীক্ষায় অন্তত ৬০% নম্বর থাকতে হবে। গ্রেডিং পদ্ধতির ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে জিপিএ ৫-এর মধ্যে ন্যূনতম ৩.৫০ এবং স্নাতক পর্যায়ে জিপিএ ৪-এর মধ্যে ৩.০০ পয়েন্ট থাকতে হবে। রেজাল্ট ভালো না হলে এই অনুদানের তালিকায় নাম আসা কঠিন। দ্বিতীয় শর্ত হলো অভিভাবকের বার্ষিক আয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পরিবারের মোট বার্ষিক আয় ২ লাখ টাকার নিচে হতে হবে। তবে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য এই আয়ের শর্ত কিছুটা শিথিল। তারা অফিস প্রধানের প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়ে সহজেই আবেদন করতে পারবেন।

দুর্ঘটনার প্রমাণ হিসেবে কিছু জরুরি কাগজপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। শিক্ষার্থীকে জেলা পর্যায়ের সিভিল সার্জন, সরকারি হাসপাতালের কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অথবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছ থেকে একটি চিকিৎসা সনদ নিতে হবে। এই সনদে শিক্ষার্থী ‘গুরুতর আহত’ মর্মে স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। এছাড়া চিকিৎসার যাবতীয় রিপোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের দেওয়া প্রত্যয়নপত্রও আপলোড করতে হবে। আবেদনকারীকে মনে রাখতে হবে যে, দুর্ঘটনাটি ঘটার সময়কাল বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অর্থবছর অথবা সর্বোচ্চ এক বছরের ব্যবধানের মধ্যে হতে হবে। অনেক পুরনো দুর্ঘটনার জন্য আবেদন করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। একজন শিক্ষার্থী একটি দুর্ঘটনার জন্য জীবনে কেবল একবারই এই চিকিৎসা অনুদান পাবেন।

আবেদন করার সময় ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষার্থী বা তার বাবা-মায়ের নামে একটি সচল অনলাইন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। যদি ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি অনলাইন না হয়, তবে টাকা পাঠাতে জটিলতা তৈরি হয়। প্রমাণের জন্য চেক বইয়ের পাতা অথবা ব্যাংক স্টেটমেন্টের কপি আপলোড করতে হবে। ভুল অ্যাকাউন্ট নম্বর দিলে বা কোনো কারণে টাকা ‘বাউন্সড’ হয়ে ফেরত গেলে ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ আর দ্বিতীয়বার টাকা পাঠাবে না। অনেক সময় দেখা যায়, মা-বাবা উভয়েই অনুপস্থিত থাকলে বৈধ অভিভাবকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টও বিবেচনা করা হয়। এই বিষয়টি শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্যই কড়াকড়ি করা হয়েছে। আবেদন জমা দেওয়ার পর সাধারণত ৩ থেকে ৪ মাস সময় লাগে যাচাই-বাছাই করতে। নির্বাচিতদের মোবাইলে এসএমএস পাঠিয়ে ফল জানিয়ে দেওয়া হবে।

আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন সনদ, মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র, রঙিন ছবি এবং ডিজিটাল স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে। সব নথি স্ক্যান করে নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড করতে হবে। যদি কোনো শিক্ষার্থী তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ওয়েবসাইটের তালিকায় খুঁজে না পায়, তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ইআইআইএন (EIIN) নম্বর উল্লেখ করে ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে ইমেইল বা ডাকযোগে আবেদন করতে হবে। এরপর ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ সেই প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে দেবে। সরকার চায় দেশের কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী যেন কেবল অর্থের অভাবে পঙ্গুত্ব বরণ না করে বা শিক্ষা থেকে দূরে সরে না যায়। এই উদ্যোগটি বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি মানবিক দিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, এই অনুদানটি কেবল একটি আর্থিক সাহায্য নয়, এটি শিক্ষার্থীদের প্রতি রাষ্ট্রের মমত্ববোধের পরিচয়। ৩১ আগস্টের ডেডলাইনটি মাথায় রেখে যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা উচিত। দেরি করলে সার্ভার জ্যাম বা অন্যান্য কারিগরি সমস্যার কারণে আবেদন মিস হয়ে যেতে পারে। যোগ্য শিক্ষার্থীরা যদি সময়মতো সঠিক তথ্যের মাধ্যমে আবেদন করে, তবে ট্রাস্টের এই ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা তাদের দুঃসময়ে অনেক বড় শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। অভিভাবক ও শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো এই তথ্যটি প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া, যাতে কোনো অভাবী ছাত্রছাত্রী এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। সরকারের এই সহায়তা কার্যক্রম দেশের সাক্ষরতার হার ১০০% এ উন্নীত করতে এবং একটি সুস্থ শিক্ষিত জাতি গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ