বিতর্ক ও নাটকীয়তায় মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায়: বঙ্গভবন থেকে পদত্যাগ পর্যন্ত একটি অধ্যায়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দিনটি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি বড় চমক নিয়ে এসেছিল। সেদিন মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই খবরটি শুনে কেবল সাধারণ মানুষ নয়, খোদ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও আকাশ থেকে পড়েছিলেন। কারণ, তখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে অনেকের নাম আলোচনায় ছিল, কিন্তু সাহাবুদ্দিনের নাম কারও কল্পনাতেও ছিল না। শোনা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা মিলে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সংসদে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে সেই শুরু থেকেই যে বিতর্কের মেঘ জমেছিল, তা শেষ পর্যন্ত ৩ বছর ৩ মাস পর তাঁর পদত্যাগের মাধ্যমেই কাটল।

সাহাবুদ্দিন যখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর অতীত ক্যারিয়ার নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। তিনি বিচারক হিসেবে কর্মজীবন শেষ করে ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ে তাঁর ভূমিকা ছিল চরম বিতর্কের কেন্দ্রে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নিয়ে দুদকের তদন্তে তিনি মূল ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে পদ্মা সেতুর মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হলেও, ২০২৫ সালের দিকে এসে সাবেক দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন অভিযোগ করেন যে, সাহাবুদ্দিন ও তাঁর সহযোগীরা মিলে সেই তদন্তটি ধামাচাপা দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার (যা তৎকালীন হিসেবে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের $ সমান) বেসিক ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি মামলায় প্রধান অভিযুক্ত শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুকে আসামি না করার পেছনেও তাঁর ওপর মহলের চাপ ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সে সময় জালিয়াতির ১০০% প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে জনমনে আজও প্রশ্ন রয়েছে।

দুদকের দায়িত্ব ছাড়ার পর সাহাবুদ্দিনের জীবন আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। তিনি সরাসরি যুক্ত হয়ে যান বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের সাথে। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ যখন জোর করে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন সাহাবুদ্দিন সেই ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। একই সাথে তিনি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টাও ছিলেন। সমালোচকেরা তাঁকে ‘এস আলমের প্রতিনিধি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতির পদে বসার ঠিক আগে তিনি ব্যাংকটি থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে জানা যায় যে, এস আলমের শাসনামলে ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রায় ১০% থেকে ১২% ক্ষতি করেছে। এই বিশাল অঙ্কের ডলার ($) পাচারের সময় তিনি ব্যাংকের নীতি নির্ধারক হিসেবে নীরব ছিলেন কেন, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁর আইনি যোগ্যতা নিয়েও জল ঘোলা কম হয়নি। দুদক আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো কমিশনার অবসরের পর প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে বসতে পারেন না। এই বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে দুটি রিট করা হলেও আদালত শেষ পর্যন্ত তাঁর পক্ষে রায় দেন। তবে সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর। ৫ আগস্ট রাতে শেখ হাসিনা যখন দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান, তখন সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন যে, শেখ হাসিনা তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এর ঠিক কয়েক মাস পর তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, শেখ হাসিনার পদত্যাগ করার কথা তিনি শুনেছেন কিন্তু তাঁর কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে পুরো দেশ ১০/১০ ভাগ অবাক হয়ে যায়।

সাহাবুদ্দিনের এই ‘মিথ্যাচার’ সাধারণ মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। বর্তমান সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল একে রাষ্ট্রপতির শপথ ভঙ্গের শামিল বলে ঘোষণা করেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ বঙ্গভবন ঘেরাও করে এবং তাঁর পদত্যাগ দাবি করে। তখন জনমতের ক্ষোভের মাত্রা ৯০% ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মানুষ মনে করেছিল, সাহাবুদ্দিন আসলে পর্দার আড়াল থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করছেন। এমনকি সম্প্রতি তিনি লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে খবর রটে। যদিও এর ১০০% সত্যতা পাওয়া যায়নি, তবে রাজনৈতিক মহলে এটি বড় অস্থিরতা তৈরি করেছিল। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য ছিল, জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনে যখন শত শত মানুষ প্রাণ দিচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি পুরোপুরি নির্বিকার ছিলেন।

অবশেষে গত শুক্রবার মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। যে নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে তিনি বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছিলেন, ঠিক সেইরকম এক বিতর্কিত অধ্যায় শেষ করে তাঁকে বিদায় নিতে হলো। বিরোধী দলগুলো এবং এনসিপি’র মতো সংগঠনগুলো তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি ও শপথ ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাহাবুদ্দিনের এই ৩ বছর ৩ মাস একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। যে ব্যক্তি একসময় বিচারের চেয়ারে বসেছিলেন, আজ তাঁকেই ইতিহাসের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, ক্ষমতা যখন ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন এর পরিণতি এমনই হয়। এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদের মর্যাদা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ