শুক্রবারই পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন: নেপথ্যে শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও বড় ধরণের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তিন জন বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আগামীকাল শুক্রবারই তাঁর পদ থেকে পদত্যাগ করতে পারেন। মূলত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সাম্প্রতিক ঘোষণার পরই রাষ্ট্রপতির এই পদত্যাগের খবর সামনে এল। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা গত কয়েকদিন আগে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তিনি আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে দেশে ফিরতে চান। তাঁর এই ঘোষণার পর থেকেই বর্তমান সরকারের ওপর জনচাপ বাড়তে থাকে, যাতে শেখ হাসিনার শেষ মিত্র হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ইতিমধ্যেই তাঁর পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র দাবি করেছে, তিনি তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জানিয়ে দিয়েছেন। অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, গত মঙ্গলবারই রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং আগামীকাল অর্থাৎ শুক্রবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এর ঘোষণা দিতে পারেন। তবে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ার কারণে যে তিনটি সূত্র এই তথ্য সরবরাহ করেছে, তারা কেউই নিজেদের পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করতে রাজি হননি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির এই প্রস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১০০% নতুন একটি মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। সেই আন্দোলনের সময় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ওই উত্তাল দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১,৪০০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। বর্তমানে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করলেও দেশের মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার খবর আসার সাথে সাথেই জনগণের দাবি ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে দ্রুত পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে। এই দাবির মুখে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর বড় ধরণের রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়।

সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেও তাঁর পদটি মূলত আলংকারিক। দেশের প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদের হাতে। তবে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে শেখ হাসিনা যখন পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান, তখন রাষ্ট্রপতির পদের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। ৭৬ বছর বয়সী মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ হওয়ায় এবং শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ায় সাহাবুদ্দিনের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি নিজেই গত ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর তিনি পদত্যাগের পরিকল্পনা করছেন। সেই সময় ওই নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রয়টার্সের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির এই পদত্যাগের সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিশ্চিত হতে বঙ্গভবনে বারবার যোগাযোগ করা হয়েছিল। একাধিকবার ফোন কল এবং খুদে বার্তা পাঠিয়েও রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে কোনো সরাসরি উত্তর পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দপ্তরের মুখপাত্রদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাঁরা তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাষ্ট্রপতির বিদায় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দেশের বর্তমান পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এই সিদ্ধান্তটি সরকার ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমেই নেওয়া হয়েছে।

সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থায়ীভাবে নতুন কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন বলে জোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে এই পদের জন্য অন্যতম যোগ্য দাবিদার করে তুলেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি শুক্রবার রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরেই পরিষ্কার হবে। সরকারের উচ্চ মহলের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর অন্তত ৯৫% সম্ভাবনা আছে যে স্পিকারই অস্থায়ীভাবে এই দায়িত্ব নিচ্ছেন।

চলতি মাসেই শেখ হাসিনা রয়টার্সকে দেওয়া ওই আলোচিত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তিনি এবং তাঁর দলের শীর্ষ নেতারা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাসিত জীবন শেষ করে দেশে ফিরবেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করবেন। তাঁর এই বক্তব্যের পরপরই দেশে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিশেষ করে যারা গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন, তাঁদের পরিবার এবং আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা ছাত্ররা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন মেনে নিতে রাজি নন। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির বিদায়কে শেখ হাসিনা পরবর্তী যুগের একটি বড় সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মাধ্যমে পুরোনো শাসনের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যাবে।

সার্বিকভাবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগামীকাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে দেশের আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোতে কোনো সংকট তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তবে অনেকেই মনে করছেন, স্পিকারের মাধ্যমে দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বড় কোনো জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। দেশের মানুষ এখন অধীর আগ্রহে শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা করছে, যখন দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে এবং নতুন কোনো নেতৃত্ব রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হতে পারেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ