সাঘাটায় দাঁতের চিকিৎসা যেন সোনার হরিণ: হাসপাতাল ফেলে কবিরাজের ঝাড়ফুঁকে ঝুঁকছেন রোগীরা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে আসেন সুস্থ হওয়ার আশায়। কিন্তু গত বেশ কিছুদিন ধরে এই হাসপাতালের একটি বিভাগ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে আছে। সেটি হলো ডেন্টাল বা দন্ত বিভাগ। দীর্ঘদিন ধরে এখানে দাঁতের কোনো চিকিৎসা হচ্ছে না। একজন দাঁতের ডাক্তার ছিলেন, তিনিও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে চলে গেছেন। এর ফলে বিপাকে পড়েছেন উপজেলার অন্তত ২ লাখ মানুষ। বিশেষ করে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চল থেকে আসা দরিদ্র মানুষগুলো যখন হাসপাতালে এসে দেখেন দাঁতের ঘরটি বন্ধ, তখন তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সরকারি সেবা না পেয়ে এই অসহায় মানুষগুলো এখন গ্রাম্য কবিরাজ আর ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করছেন, যা তাদের স্বাস্থ্যকে আরও ১০০% ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সাঘাটা উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল থেকে আসা রোগীদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। নদী পার হয়ে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তারা যখন উপজেলা সদরে পৌঁছান, তখন পকেটের টাকা আর শরীরের শক্তি দুটোই ফুরিয়ে যায়। সাঘাটা বাজারের বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর আলম কৌশিক (৩৫) তেমনই একজন ভুক্তভোগী। গত ৭ দিন ধরে তার দাঁতে অসহ্য ব্যথা। ঠিকমতো খেতে পারছেন না, ঘুমাতে পারছেন না। ব্যথায় কাতর হয়ে তিনি সরকারি হাসপাতালে এসেছিলেন মাত্র ১০ বা ২০ টাকার টিকিটে চিকিৎসা নিতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে শোনেন ডাক্তার নেই। জাহাঙ্গীর আলম আক্ষেপ করে বলেন, “দাঁতের ব্যথায় আমার জীবন বের হয়ে যাচ্ছে। ৭ দিন ধরে কষ্ট করছি। পকেটে টাকা নেই যে শহরে গিয়ে প্রাইভেট ডাক্তার দেখাব। হাসপাতালে এসে শুনি ডাক্তার ছুটিতে। বাধ্য হয়ে গ্রামের এক কবিরাজের কাছ থেকে গাছের শিকড় আর ঝাড়ফুঁক নিয়েছি। তাতে ব্যথা তো কমেনি, উল্টো মুখ ফুলে গেছে।”

একই চিত্র দেখা গেল সিপিগাড়ামারা গ্রামের হোসনে আরা বেগমের (২৯) ক্ষেত্রে। তিনি তার ছোট ছেলেকে নিয়ে নদী পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। ছেলের দাঁতে পোকা আর প্রচণ্ড ব্যথা। হোসনে আরা বলেন, “চরাঞ্চল থেকে আসতে আমাদের কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। ভাড়া লাগে অনেক। সরকারি হাসপাতালে দাঁতের চিকিৎসা বন্ধ থাকবে এটা ভাবিনি। এখন ছোট ছেলেটা ব্যথায় চিৎকার করছে। হাসপাতালে ডেন্টাল রুমের সামনে গিয়ে দেখি সেখানে শিশুদের অন্য কাজ চলছে। আমাদের মতো গরিবের দেখার কি কেউ নেই?” স্থানীয়রা জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে অন্তত ৯০% দরিদ্র রোগী এখন বাধ্য হয়ে হাতুড়ে ডাক্তার বা কবিরাজের কাছে যাচ্ছেন। এই সুযোগে অসাধু চক্রগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৩০০% থেকে ৫০০% পর্যন্ত বেশি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এবং ভুল চিকিৎসা দিচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সংকটের পেছনে প্রশাসনিক কিছু জটিলতা কাজ করছে। এখানে একজন মাত্র বিডিএস (BDS) ডিগ্রিধারী চিকিৎসক ছিলেন, কিন্তু তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিনের ছুটিতে আছেন। নিয়ম অনুযায়ী কোনো ডাক্তার ছুটিতে থাকলে সেখানে বিকল্প ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। তার ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেন্টাল টেকনোলজিস্টের অভাব। এই পদের একমাত্র কর্মীকে প্রেষণে (ডেপুটেশনে) পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে পার্শ্ববর্তী ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ফলে যন্ত্র থাকলেও তা চালানোর মানুষ নেই। বর্তমানে ডেন্টাল ইউনিটের কক্ষটি আর দাঁতের রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে না। সেখানে এখন শিশুদের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার কাজ চালানো হচ্ছে। মূল্যবান সব সরঞ্জাম এখন অবহেলায় পড়ে নষ্ট হওয়ার পথে।

স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মতে, দাঁতের সমস্যায় কবিরাজি বা অপচিকিৎসা অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। যত্রতত্র ঝাড়ফুঁক বা না বুঝে দাঁত তুললে ইনফেকশন থেকে শুরু করে ওরাল ক্যান্সারের ঝুঁকি ১০ গুণ বেড়ে যায়। গাইবান্ধার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম থাকায় তারা দ্রুত এসব কুসংস্কারের ফাঁদে পা দেয়। সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যদি দ্রুত সেবা চালু না করে, তবে আগামী কয়েক মাসে এই এলাকায় দাঁতের জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০% থেকে ২৫% বৃদ্ধি পেতে পারে।

এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মো. ইলতুতমিশ আকন্দ পিন্টু পরিস্থিতির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের ডেন্টাল সার্জন সত্যিই অসুস্থ এবং তিনি ছুটিতে আছেন। তিনি কবে নাগাদ কাজে ফিরতে পারবেন তা নিশ্চিত নয়। তবে আমরা বসে নেই। আমাদের ডেন্টাল টেকনোলজিস্টকে অন্য জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছি। বিষয়টি সিভিল সার্জন স্যারকেও জানানো হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুতই আমরা নতুন কাউকে দিয়ে বা বিকল্প উপায়ে ডেন্টাল ইউনিটটি চালু করতে পারব।”

তবে সাধারণ মানুষের দাবি ভিন্ন। তারা কোনো আশ্বাস নয়, বরং দৃশ্যমান সমাধান চান। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র একজন ডাক্তার এমনিতেই অপ্রতুল। সেখানে যদি সেই একজনও ছুটিতে থাকেন, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল অন্য কোনো উপজেলা থেকে অন্তত সপ্তাহে ২ বা ৩ দিনের জন্য একজন ডাক্তার এখানে সংযুক্ত করা। সাঘাটার চরাঞ্চল থেকে আসা রোগীরা চায়, তাদের এই কষ্ট যেন কর্তৃপক্ষ অনুভব করে। অবিলম্বে টেকনোলজিস্টকে ফিরিয়ে এনে এবং একজন বিকল্প চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দাঁতের বিভাগটি সচল করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, চরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ এই আধুনিক যুগেও ঝাড়ফুঁক আর কবিরাজের কাছে গিয়ে নিজেদের জীবন বিপন্ন করতে থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ