শাহ্ পারভেজ সংগ্রাম, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধা জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র এখন উত্তাল। একদিকে ধর্ষণের চেষ্টার মতো জঘন্য অভিযোগ, অন্যদিকে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া মামলা আর পুলিশের কথিত হয়রানিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। গতকাল জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের সামনে কয়েক শ’ নারী-পুরুষের এক বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। ভেরামারা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা এই মানববন্ধনের ডাক দেন। তাঁদের একটাই দাবি—রেস্টুরেন্টে আগুনের ঘটনায় দায়ের করা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় যেন কোনো নিরপরাধ মানুষকে সাজা পেতে না হয় এবং এই সুযোগে কেউ যেন চাঁদাবাজি করতে না পারে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৪ জুন। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, ভেরামারা ব্রিজ সংলগ্ন একটি জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টের এক কর্মচারী এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এই খবরটি এলাকায় জানাজানি হওয়ার সাথে সাথে ১০০% মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উত্তেজিত জনতা তাৎক্ষণিকভাবে ওই এলাকায় জড়ো হয় এবং অভিযুক্তের বিচারের দাবি জানায়। একপর্যায়ে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায় এবং বিক্ষুব্ধ জনতা ওই রেস্টুরেন্টটিতে অগ্নিসংযোগ করে। স্থানীয়দের দাবি, এই ঘটনাটি ছিল তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল, এখানে কোনো পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে।
মানববন্ধনে আসা বক্তারা অভিযোগ করেন, রেস্টুরেন্টটির মালিক মানিক মিয়া এখন এই আগুনের ঘটনাকে পুঁজি করে পুরো গ্রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি নিজের ইচ্ছেমতো অনেক সাধারণ মানুষের নাম মামলায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন, যারা আগুনের সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই মামলার ভয় দেখিয়ে এখন নিরীহ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতানোর চেষ্টা চলছে। তারা জানান, গ্রামে বর্তমানে ৮০% পুরুষ গ্রেপ্তার আতঙ্কে রাতে বাড়িতে থাকতে পারছেন না। ছোট ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার পথে, কারণ পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। গ্রামের মানুষের দাবি, একটি রেস্টুরেন্ট মালিকের দাপটে পুরো এলাকার শান্তি নষ্ট হতে পারে না।
মানববন্ধনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য রাখেন সাবেক শিবির সভাপতি রুম্মন। তিনি বলেন, “আমরা যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে। শিশু ধর্ষণের চেষ্টা যেমন বড় অপরাধ, তেমনি রেস্টুরেন্টে আগুন দেওয়াও সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু আপনি যদি আসল অপরাধীকে আড়াল করে পুরো গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে চান, তবে আমরা তা মেনে নেব না।” তিনি অভিযোগ করেন, মানিক মিয়া এই মামলার মাধ্যমে ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাচ্ছেন এবং অনেক নিরীহ ব্যক্তিকে আসামী করেছেন যাদের সাথে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান যেন অতি দ্রুত এই মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত করা হয়।
গ্রামের মহিলাদের মধ্য থেকে লড়াকু কণ্ঠে বক্তব্য দেন বেবী আক্তার, আশা আক্তার ও রোকসানা আক্তার। তাঁরা বলেন, “আমাদের অপরাধ কী? আমরা তো আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা চেয়েছি। যে শিশুটির ওপর হামলা হলো, তার বিচার তো কেউ করছে না। উল্টো আমাদের স্বামীদের পুলিশ ধরছে। মানিক মিয়ার গুন্ডাবাহিনী এখন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মামলার নাম কেটে দেওয়ার কথা বলে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করছে।” এই নারীদের দাবি, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেন সরেজমিনে এলাকায় যান এবং মানুষের জীবনযাত্রার করুণ দশা দেখে আসেন। তাঁরা হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, হয়রানি বন্ধ না হলে তাঁরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করতে বাধ্য হবেন।
এদিকে, মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে রেস্টুরেন্ট মালিক মানিক মিয়ার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাঁর রেস্টুরেন্টে কয়েক লাখ টাকার সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তিনি দাবি করেন, এই আগুনের কারণে তাঁর প্রায় ২০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তিনি নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করেছেন যারা সরাসরি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে লিপ্ত ছিল। তবে গ্রামবাসীদের দাবি, মানিক মিয়া তাঁর ক্ষতির অংক বাড়িয়ে বলছেন এবং অনেককে অযথা আসামী করে চাপে ফেলার চেষ্টা করছেন। ব্যবসায়িক ক্ষতির দোহাই দিয়ে গ্রামের নিরীহ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করাকে ‘জুলুম’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
গাইবান্ধা সদর থানার পুলিশ জানিয়েছে, রেস্টুরেন্টে আগুনের ঘটনায় একটি নিয়মিত মামলা হয়েছে এবং সেই মামলার তদন্ত চলছে। পুলিশ কাউকে অনর্থক হয়রানি করছে না বলেই তাদের দাবি। তবে গ্রামবাসীরা বলছেন অন্য কথা। তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ রাতের বেলা তল্লাশির নামে এলাকায় ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করছে। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিরা বলছেন, “আমরা শান্তি চাই। যারা আগুন দিয়েছে তাঁদের ধরুন, আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু যাদের অপরাধ নেই, তাঁদের ধরে নিয়ে যাওয়া বা টাকা চাওয়া অন্যায়।” বিশেষ করে এলাকার শ্রমজীবী মানুষ যারা প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করে সংসার চালায়, তাঁরা এখন কাজে যেতে পারছেন না।
মানববন্ধন শেষে আন্দোলনকারীরা জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। স্মারকলিপিতে তাঁরা তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরেন: প্রথমত, শিশু ধর্ষণের চেষ্টার প্রকৃত তদন্ত ও বিচার; দ্বিতীয়ত, রেস্টুরেন্টে আগুনের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া; এবং তৃতীয়ত, পুলিশের হয়রানি ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি বন্ধ করা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন ভুক্তভোগী না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখা হবে। গাইবান্ধার সাধারণ মানুষ এখন এই আশ্বাসের বাস্তবায়ন দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
















