‘সাংবাদিক জেগে উঠুক নির্ভয়ে’: গাইবান্ধা জেলা মডেল প্রেসক্লাবের জমকালো প্রথম বর্ষপূর্তি উদযাপন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গাইবান্ধা জেলার সাংবাদিকতা অঙ্গনে এক নতুন উদ্দীপনা ও সাহসের নাম ‘জেলা মডেল প্রেসক্লাব’। “সাংবাদিক জেগে উঠুক নির্ভয়ে” এই বলিষ্ঠ স্লোগানকে ধারণ করে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনটি সফলভাবে তাদের পথচলার প্রথম বছর পূর্ণ করল। বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যের পথে অবিচল থাকার অঙ্গীকার নিয়ে গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়েছে ক্লাবটির প্রথম বর্ষপূর্তি। সকাল ১১টার দিকে গাইবান্ধা পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিক সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের ঢল নামে। এই এক বছরের পথচলায় ক্লাবটি প্রমাণ করেছে যে, ঐক্যবদ্ধ থাকলে শত বাধা পেরিয়েও জনগণের কণ্ঠস্বর হওয়া সম্ভব। অনুষ্ঠানের প্রতিটি পরতে ছিল সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষার নতুন শপথ।

প্রথম বর্ষপূর্তির এই বিশেষ আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা মডেল প্রেসক্লাবের সভাপতি ও নির্ভীক সংবাদকর্মী রানা ইস্কান্দার রহমান। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সঞ্চালনা করেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ। সভার শুরুতেই ক্লাবের গত ৩৬৫ দিনের কার্যক্রমের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে যখন সাংবাদিকতার ওপর নানা দিক থেকে চাপ আসছে, তখন এই ক্লাবটি সাংবাদিকদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ক্লাবের সদস্যরা গত এক বছরে জেলার প্রায় ৯০% প্রধান জনদুর্ভোগের খবর সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন, যা প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং অনেক সমস্যার সমাধানও হয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের প্রতি এই ১০০% একাগ্রতাই ক্লাবটিকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাইবান্ধা জেলা পরিষদ প্রশাসক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ডাক্তার সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “সাংবাদিকরা হলো সমাজের দর্পণ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। জেলা মডেল প্রেসক্লাব তাদের নামের সার্থকতা বজায় রেখে গত এক বছরে যেভাবে কাজ করেছে, তা সত্যি প্রশংসনীয়। আমরা চাই সাংবাদিকরা কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই সত্য প্রকাশ করুক।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং সাংবাদিকদের কল্যাণে জেলা পরিষদ সব সময় পাশে থাকবে। তিনি ক্লাবের আধুনিকায়নের জন্য এবং সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনে বিশেষ তহবিল গঠনের আশ্বাস দেন, যা স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য একটি বড় সুসংবাদ।

বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে গাইবান্ধা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুর রশিদ বলেন, “শিক্ষিত ও সচেতন সমাজ গঠনে সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে গাইবান্ধার মতো মফস্বল এলাকায় চরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র তুলে ধরতে এই ক্লাবের সদস্যরা যে ঝুঁকি নেন, তা অতুলনীয়।” নিউজ জনতার প্রধান সম্পাদক মাহবুব হোসেন মাবুদ তার বক্তব্যে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিড়ে মূলধারার সাংবাদিকতা যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিটি সংবাদের সত্যতা অন্তত ৯৯% নিশ্চিত হয়ে তবেই তা প্রকাশ করা উচিত। কোনো ভুল তথ্যের কারণে যেন কারো সম্মানহানি না হয়, সেদিকে সজাগ থাকার জন্য তিনি তরুণ সাংবাদিকদের পরামর্শ দেন।

মুক্ত আলোচনা পর্বে গাইবান্ধা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন পুলিশের সাথে সাংবাদিকদের সুসম্পর্কের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “পুলিশ এবং সাংবাদিক যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, তবে সমাজ থেকে অপরাধ দমন করা ১০০% সহজ হয়ে যায়। সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অনেক সময় বড় বড় অপরাধীদের ধরতে সক্ষম হই।” এ সময় আরও বক্তব্য দেন বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং জেলার সিনিয়র সাংবাদিকরা। তারা ক্লাবের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানান। বক্তারা বলেন, সাংবাদিকরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে সমাজের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যাবে।

আলোচনা সভার আনুষ্ঠানিকতা শেষে আয়োজন করা হয় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। গাইবান্ধার স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে এই পর্বটি ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান এবং ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য দর্শকদের মুগ্ধ করে। স্থানীয় কিশোর-কিশোরীদের পরিবেশিত লোকনৃত্যটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে অন্যরকম এক আমেজ তৈরি করে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফুটে ওঠে উত্তরবঙ্গের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। এই আনন্দঘন মুহূর্তগুলো সাংবাদিকদের কঠিন ও ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করে এক নতুন মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। সাংবাদিকরা যে কেবল খবরের পেছনেই ছোটেন না, তারা যে শিল্পেরও সমঝদার, তা এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফুটে ওঠে।

বিকেল নাগাদ বর্ষপূর্তির এই উৎসব শেষ হয় এক প্রীতিভোজের মাধ্যমে। ক্লাব নেতৃবৃন্দ জানান, গত এক বছরে তারা অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছেন। ক্লাবের নিজস্ব কার্যালয় স্থাপন এবং আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি কেনায় তারা ইতিমধ্যে বেশ কিছু অর্থ ব্যয় করেছেন, যার পরিমাণ প্রায় কয়েক হাজার ডলারের সমতুল্য (বেসরকারি ও ব্যক্তিগত অনুদান মিলিয়ে)। তবে টাকার চেয়েও তাদের কাছে বড় সাফল্য হলো মানুষের আস্থা অর্জন। আগামী দিনে ক্লাবের পক্ষ থেকে জেলার গ্রামগঞ্জে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়াও দুস্থ সাংবাদিকদের সহায়তায় একটি আপদকালীন কল্যাণ তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে।

সবশেষে, গাইবান্ধা জেলা মডেল প্রেসক্লাবের এই প্রথম বর্ষপূর্তি কেবল একটি অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল সাংবাদিকদের আত্মমর্যাদা ও অধিকার আদায়ের একটি সম্মিলিত আওয়াজ। ক্লাবের সদস্যরা শপথ নিয়েছেন যে, তারা কখনোই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন। গাইবান্ধার মানুষের অধিকার রক্ষায় এই ক্লাবটি আগামীতে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখবেএমনটাই প্রত্যাশা করছেন জেলার সাধারণ জনগণ। বর্ষপূর্তির এই আনন্দধারা জেলার প্রতিটি সংবাদকর্মীর মনে নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ