সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে পরিচিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) শুধু দেশ রক্ষায় নয়, সাধারণ মানুষের বিপদে-আপদেও সব সময় পাশে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জেলার সীমান্তবর্তী অত্যন্ত দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তারা বড় পরিসরে একটি দিনব্যাপী বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করে। গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকাল ৯টা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার প্রত্যন্ত নারায়ণপুর ইউনিয়নের মাহমুদা মতিউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এই মেডিকেল ক্যাম্পের কার্যক্রম শুরু হয়। ৫৩ বিজিবির নিজস্ব অর্থায়নে এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই মহতি উদ্যোগে চরাঞ্চলের অবহেলিত মানুষের মাঝে নতুন আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছে।
নারায়ণপুর ইউনিয়নটি মূলত পদ্মা নদীর তীরবর্তী একটি দুর্গম চরাঞ্চল। এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন কঠিন, তেমনি উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অঞ্চলের প্রায় ৯০% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন এবং আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এমন বাস্তবতায় বিজিবির এই মেডিকেল ক্যাম্পটি এলাকার মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয়। সকাল থেকেই শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু তাদের শারীরিক সমস্যার কথা জানাতে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ নিতে স্কুল মাঠে ভিড় করতে শুরু করেন। বিজিবির সদস্যরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিটি রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছে দেন। দিনের শেষে দেখা যায়, প্রায় ৭০০ জন অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে উন্নত মানের চিকিৎসা সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়েছে।
এই মেডিকেল ক্যাম্পের সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্য দিক ছিল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের উপস্থিতি। কেবল সাধারণ ডাক্তার নয়, বিজিবি এখানে ৮ জন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একটি দল মোতায়েন করেছিল। এই টিমে ছিলেন বিজিবি রাজশাহী সেক্টরের মেডিকেল অফিসার এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের দুজন নামকরা নারী ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ। এছাড়াও চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের চোখের সমস্যা সমাধানে উপস্থিত ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ চক্ষু হাসপাতালের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ৫৩ বিজিবি ও মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি)-এ কর্মরত দুজন বেসামরিক চিকিৎসকও নিরলসভাবে সেবা প্রদান করেন। এতজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে একসঙ্গে হাতের কাছে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বেশ আনন্দিত ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
চরাঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা হলো কৃষিকাজ ও পশুপালন। গবাদি পশুই তাদের একমাত্র সম্বল। মানুষের পাশাপাশি পশুর স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে বিজিবি এখানে একটি ভেটেরিনারি ক্যাম্পও পরিচালনা করে। এই ক্যাম্পে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পশু হাসপাতালের একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০০টি গরু, মহিষ ও ছাগলের চিকিৎসা দেওয়া হয়। পশুর বিভিন্ন জটিল রোগের সমাধান এবং বিনামূল্যে কৃমিনাশকসহ অন্যান্য ভিটামিন জাতীয় ওষুধও বিতরণ করা হয়েছে। বিজিবির এমন দূরদর্শী চিন্তাভাবনা স্থানীয় খামারি ও কৃষকদের ১০০০% উৎসাহ বাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ পশুগুলো অসুস্থ হলে তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার ভয় থাকে।
অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ৫৩ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান, পিএসসি। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে পুরো কার্যক্রম তদারকি করেন। বিজিবি অধিনায়ক তার বক্তব্যে বলেন, “বিজিবি শুধু সীমান্তে অস্ত্র হাতে পাহারা দেয় না, বরং মানুষের বিপদে ভাই হিসেবে পাশে দাঁড়ায়। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা এই মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছি।” অনুষ্ঠানে ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়কসহ বিজিবির অন্যান্য কর্মকর্তা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। বিজিবি কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেন যে, সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ ১০০% আন্তরিকতার সাথে ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাওয়া হবে।
পুরো দিন জুড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল। নারায়ণপুরের একজন বয়স্ক বাসিন্দা আবেগের সাথে জানান, “আমরা চরের মানুষ, শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখানো আমাদের জন্য অনেক খরচের ব্যাপার। কিন্তু আজ বাড়ির কাছেই বড় ডাক্তার দেখালাম আর সব ওষুধ ফ্রিতে পেলাম।” এই ক্যাম্পের মাধ্যমে বিজিবি প্রমাণ করেছে যে তারা কেবল সীমান্তের প্রহরী নয়, বরং সীমান্তবাসীর অকৃত্রিম বন্ধু। সরকারি এই সেবামূলক কাজটির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সাথে বিজিবির সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে, যা সীমান্ত অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিশেষে, বিজিবির এই মহান উদ্যোগটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর ছাপ রেখে গেছে।
















