জুলাইয়ের চেতনা কারো একার সম্পদ নয়, ব্যবসা বন্ধ করে স্পষ্ট রাজনীতি দেখান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বা সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একার সম্পত্তি নয়, বরং এটি দেশের সাধারণ মানুষের অর্জন। তাই এই চেতনাকে পুঁজি করে কেউ যেন রাজনৈতিক ব্যবসা না করে, সেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কেবল চটকদার রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে বা পূর্বের কোনো ঘটনার দোহাই দিয়ে দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। জনগণের মন জয় করতে হলে তাদের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি স্বচ্ছ এবং বাস্তবসম্মত রূপরেখা তুলে ধরতে হবে।

আজ রোববার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের অন্যতম শরিক দল গণ অধিকার পরিষদ (জিওপি) এই সভার আয়োজন করে। সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে রাজনীতিতে ‘নতুন বন্দোবস্ত’ কিংবা ‘দায় ও দরদের রাজনীতি’ এমন অনেক গালভরা শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এসবের প্রকৃত অর্থ কী? রাষ্ট্র পরিচালনা, সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা কিংবা জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনে এই ধারণাগুলো ১০০% কার্যকর হবে কি না, তা জনগণ এখনো জানে না। তাই ধোঁয়াশা তৈরি না করে সরাসরি কাজের পরিকল্পনা মানুষের সামনে আনা উচিত।

আলোচনা সভায় সালাহউদ্দিন আহমদ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাম সরাসরি না নিলেও তাদের রাজনৈতিক আদর্শের দিকে ইঙ্গিত করে কঠোর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যারা এখনো সাতচল্লিশের চেতনার কথা বলে বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়, তাদের দিন শেষ হয়ে গেছে। তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা তো সাতচল্লিশে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন না, একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামের সময়ও আপনাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এখন দয়া করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের সঙ্গে থাকুন, এতেই সাধারণ মানুষের মঙ্গল হবে।’ তিনি মনে করেন, স্রোতের বিপরীতে হেঁটে বা জনগণের চাহিদাকে উপেক্ষা করে কেউ যদি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে জনগণ তাদের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে। রাজনৈতিক বিভাজন নয়, বরং এখন জাতীয় ঐক্যের সময়।

গত ১৭ বছর ধরে চলা ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাইয়ের এই বিজয় একদিনে আসেনি। এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর আন্দোলনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এই আন্দোলনে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এই রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদের এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে আইনের শাসন থাকবে ১০০ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে যেন এই ঐক্য দুর্বল না হয়, সেদিকে প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মীকে খেয়াল রাখতে হবে। যদি আমরা নিজেরা বিভক্ত হয়ে পড়ি, তবে স্বৈরাচারের পুনরুত্থান ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।

দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং সংস্কারের দাবি প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, বরং সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কার অপরিহার্য। তিনি আশ্বাস দেন যে, সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি এবং বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছে। বিভিন্ন অংশীজন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতেই সংস্কারের চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরি করা হবে। তাঁর মতে, কোনো সিদ্ধান্তই জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না; বরং প্রতিটি পদক্ষেপ হবে অংশগ্রহণমূলক। ২০২৪ সালের এই অভ্যুত্থান আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে একটি নতুন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার, আর সেই সুযোগ হেলায় হারানো যাবে না।

বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্যগুলো স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন কেবল একজন ব্যক্তিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য ছিল না, এটি ছিল একটি পচা ও দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেম বদলানোর লড়াই। সাধারণ মানুষ চায় একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার থাকবে এবং প্রশাসন হবে জনবান্ধব। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতি ছেড়ে মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বাস করেন, যদি আমরা শহীদের রক্তের মর্যাদা দিতে পারি, তবেই বাংলাদেশ সঠিক পথে এগোবে।

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর। তিনি বলেন, জুলাইয়ের বিপ্লব আমাদের ঋণী করে দিয়েছে এবং এই ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো একটি ইনসাফ কায়েম করা। এ ছাড়া সভায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনসহ জোটের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা সবাই একমত পোষণ করেন যে, কোনো বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যেই এখন সবাইকে কাজ করতে হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ