১৬ বছর পর ফের বিশ্বসেরা স্পেন: মেসিকে কাঁদিয়ে নিউ জার্সিতে ‘লা ফুরিয়ারোজা’দের রাজত্ব

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের প্রকাণ্ড লাউডস্পিকারে তখন তারস্বরে বাজছে ইউরোপীয় রকের চিরচেনা সেই সুর, ‘দ্য ফাইনাল কাউন্টডাউন’। গ্যালারিতে উপস্থিত ৮২,৫০০ দর্শকের উন্মাদনা তখন আকাশচুম্বী। তবে মাঠের লড়াইয়ে তখনো গোলশূন্য সমতা। খেলা গড়িয়েছে অতিরিক্ত সময়ে। ঘড়ির কাঁটা ১০৬ মিনিটে পৌঁছাতেই যেন ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নতুন এক অধ্যায় লেখা হলো। পেদ্রো পোরোর দারুণ এক ক্রস ভেসে এল বাঁ দিক থেকে, নিকো উইলিয়ামস মাথা ছুঁইয়ে বলটা ঠেলে দিলেন পেছনের দিকে। আর ঠিক সেখানেই বাঘের মতো ওঁত পেতে থাকা ফেরান তোরেস বিদ্যুৎবেগে পা ছুঁইয়ে বল জালে জড়ালেন। ১-০! পুরো স্টেডিয়ামের এক প্রান্ত তখন লাল উৎসবে মাতোয়ারা, আর অন্য প্রান্তে আকাশী-নীল গ্যালারিতে নেমে এসেছে এক অতলান্তিক নীরবতা। এই একটি গোলই শেষ পর্যন্ত লিখে দিল ২০২৬ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত নিয়তি।

১৬ বছর আগে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই এক গোল যেমন স্পেনকে প্রথমবারের মতো বিশ্বসেরা করেছিল, ২০২৬ সালে আমেরিকার মাটিতে তোরেসের এই গোলটিও তাদের এনে দিল দ্বিতীয় শিরোপা। স্পেনের জার্সিতে এখন থেকে জ্বলজ্বল করবে দুটি তারা। অন্যদিকে, লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নটা নিউ জার্সির ঘাসেই চুরমার হয়ে গেল। এই জয়টা স্পেনের জন্য কেবল ভাগ্যের লিখন ছিল না, ছিল মাঠজুড়ে তাদের দাপুটে ফুটবল আর কৌশলের পুরস্কার। পুরো ম্যাচে স্পেন যেভাবে আধিপত্য বজায় রেখেছে, তাতে দিনশেষে শিরোপাটা তাদের হাতেই মানিয়েছে।

আর্জেন্টিনার জন্য এই রাতটা ছিল চরম হতাশার এক গল্প। যে দলটা গত কাতার বিশ্বকাপে আক্রমণাত্মক ফুটবলে বিশ্ব জয় করেছিল, তারা এই ফাইনালে যেন নিজেদের ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিল। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, পুরো ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা গোলের লক্ষ্যে একটি শটও নিতে পারেনি (০% অন-টার্গেট শট)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে এমন ঘটনা সত্যিই বিরল। মাঝমাঠের দখল নিতে আর্জেন্টিনা ফুটবলাররা সুন্দর ফুটবলের চেয়ে শরীরী লড়াইয়ের ওপর বেশি নির্ভর করেছিলেন। রদ্রিগো দি পল এবং লিয়ান্দ্রো পারেদেস বল কেড়ে নেওয়ার চেয়ে স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের ফাউল করতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। রক্ষণের লিসান্দ্রো মার্তিনেজ চোট পেয়ে মাঠ ছাড়ার আগে হলুদ কার্ডও দেখেন। সব মিলিয়ে নীল-সাদা শিবিরের রক্ষণভাগ ছিল তটস্থ।

অন্যদিকে স্পেনের আক্রমণ ছিল অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো—একটা শেষ হতে না হতেই আরেকটা আছড়ে পড়ছিল আর্জেন্টিনার ডি-বক্সে। ১৭ বছর বয়সী তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামাল যেন একাই নাচিয়ে ছাড়লেন আর্জেন্টিনার পুরো রক্ষণভাগকে। ম্যাচের শুরুর দিকেই দানি ওলমোর সঙ্গে তাঁর চমৎকার বোঝাপড়ায় গোল প্রায় হয়েই যাচ্ছিল, কিন্তু এমিলিয়ানো মার্তিনেজ সে যাত্রা আর্জেন্টিনাকে বাঁচিয়ে দেন। স্পেনের বল পজিশন ছিল প্রায় ৬৫%, যা প্রমাণ করে ম্যাচে তাদের নিয়ন্ত্রণ কতটা মজবুত ছিল। দানি ওলমো, নিকো উইলিয়ামস আর ফেরান তোরেসের ত্রিভুজ আক্রমণ আর্জেন্টিনাকে পুরো সময় কোণঠাসা করে রেখেছিল। মাঠের প্রতিটি প্রান্তে স্প্যানিশ ফুটবলারদের গতি আর নিখুঁত পাসিং ছিল চোখে পড়ার মতো।

আর্জেন্টিনা যদি ১০৬ মিনিট পর্যন্ত গোল না খেয়ে টিকে থাকে, তবে তার ১০০% কৃতিত্ব দিতে হবে তাদের গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে। তিনি এদিন গোলপোস্টের নিচে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। লাপোর্তের হেডার, রদ্রির দূরপাল্লার বুলেট গতির শট কিংবা উইলিয়ামসের ওয়ান-টু-ওয়ান আক্রমণ সবই রুখে দিয়েছেন তিনি। পুরো ম্যাচে তিনি মোট ১০টি সেভ করেছেন, যা বিশ্বকাপের ফাইনালের ইতিহাসে নতুন এক বিশ্ব রেকর্ড। ম্যাচের শেষের দিকে মেজাজ হারিয়ে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হয়। তবুও মার্তিনেজ ইয়ামালের ফ্রি-কিক বাঁচিয়ে আশা জাগিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১০৬ মিনিটে তোরেসের সেই নিখুঁত ফিনিশিংয়ের কাছে হার মানতেই হয় তাকে।

লিওনেল মেসির জন্য এই রাতটা ছিল এক বিষাদময় বিদায়ের করুণ সুর। যে ফুটবল ঈশ্বর একদিন কাতারকে উৎসবে ভাসিয়েছিলেন, সেই মেসিকে নিউ জার্সির মাঠে আজ বড় বেশি ক্লান্ত দেখিয়েছে। ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে তাঁর পায়ে বল এসেছিল মোটে ৪-৫ বার। তাঁর শরীরী ভাষায় সেই চেনা ধার ছিল না, ছিল কেবল এক অসহায় রাজার নীরব উপস্থিতি। হয়তো বয়সের ভার অথবা স্পেনের কড়া মার্কিং মেসি যেন নিজের ছায়া হয়েই মাঠে ঘুরে বেরিয়েছেন। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে টিকিটের গড় দাম ছিল প্রায় ৫,০০০ ডলার, কিন্তু মেসির জাদুকরী ফুটবল দেখার আশায় আসা হাজারো ভক্তকে ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। ৮২,৫০০ দর্শকের চোখের সামনে ফুটবল তাকে সব দিলেও, নিজের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে এক বুক হাহাকার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হলো তাকে।

রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, স্পেনের পুরো বেঞ্চ দৌড়ে মাঠের ভেতর ঢুকে পড়ে। ২০১০-এর পর ২০২৬ মাঝখানের এই ১৬ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে স্পেন আবার বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে বসল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জন্য এটি কেবল একটি হার নয়, বরং একটি সোনালী প্রজন্মের বিদায়ঘণ্টা। নিউ জার্সির আকাশে যখন আতশবাজির মেলা বসছিল, তখন মাঠের একদিকে স্প্যানিশদের উল্লাস আর অন্যদিকে লিওনেল মেসির ছলছল চোখ বলে দিচ্ছিল ফুটবল কত সুন্দর, আবার কত নিষ্ঠুর!

সম্পর্কিত নিবন্ধ