মোঃ মেহেদী হাসান, স্টাফ রিপোর্টার (গাইবান্ধা):
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলা এখন শোক আর গর্বের এক মোহনায় দাঁড়িয়ে। জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যারা রাজপথে বুক পেতে প্রাণ দিয়েছিল, তাদের স্মরণে আজ সারা দেশের মতো সাঘাটায় পালিত হলো ‘জুলাই শহীদ দিবস-২০২৬’। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা, বরং ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে আসা শ্রদ্ধা। সাঘাটা উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষ আজ লোকে লোকারণ্য ছিল। উপস্থিত সবার মনেই ছিল সেই একটাই প্রশ্ন যে রক্তের বিনিময়ে আমরা নতুন স্বাধীনতা পেলাম, তার মর্যাদা আমরা কতটুকু রক্ষা করতে পারছি? অনুষ্ঠানের শুরুতেই শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়, যা পুরো পরিবেশকে অত্যন্ত আবেগঘন করে তোলে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল কবীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আব্দুল ওয়ারেছ। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছিলাম ১৯৭১ সালে, আর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা সেই স্বাধীনতাকে পূর্ণতা দিয়েছে। এই বিপ্লবে প্রায় ১০০% মানুষের অংশগ্রহণ ছিল বলেই আজ আমরা স্বৈরাচারমুক্ত একটি দেশে প্রাণভরে কথা বলছি।” সভায় তিনি শহীদদের ত্যাগের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং জানান যে, সাঘাটার প্রতিটি ঘরে এই বিপ্লবের চেতনা ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের এই সরব উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, দেশের স্বার্থে সবাই আজ এক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ।
সাঘাটা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাহবুব আলম এক বিশেষ বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, “পুলিশ বাহিনী এখন জনগণের প্রকৃত সেবক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলছে। আগে যেখানে পুলিশের ওপর মানুষের আস্থার হার ছিল মাত্র ২০% থেকে ৩০%, এখন আমাদের লক্ষ্য সেটাকে ১০০% এ উন্নীত করা। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদের একটি নিরাপদ ও শান্তিময় সমাজ গড়ে তুলতে হবে।” এছাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা তাদের নিজ নিজ বিভাগের কাজের মাধ্যমে শহীদদের স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার করেন। তারা মনে করেন, সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করে দ্রুত ও স্বচ্ছ সেবা প্রদানই শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন।
অনুষ্ঠানে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যায় যখন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী হাজী এবং উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মো. ইবরাহীম একই সুরে দেশের ভবিষ্যতের কথা বলেন। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে কোনো বিভেদ, দুর্নীতি বা প্রতিহিংসার জায়গা নেই। আব্দুল গফুর সরকার ও মইন প্রধান লাবু রাজনৈতিক সম্প্রীতির ওপর জোর দেন। তাদের কথায় উঠে আসে যে, দেশের উন্নয়নের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্তত ৯০% বিষয়ে ঐক্যমত থাকা জরুরি। বিশেষ করে বেকারত্ব দূর করা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
বক্তারা জুলাই বিপ্লবের সেই উত্তাল সময়গুলো স্মরণ করেন। তারা বলেন, সেই সময় রাজপথে নামা সাধারণ ছাত্রদের ওপর যে নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছিল, তার সঠিক বিচার হওয়া এখন সময়ের দাবি। উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতগুলো গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছে, তার মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ছিল সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষয়ী এবং গণমুখী। বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন দপ্তরের কার্যক্রমে পরিবর্তন এনে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার কাজ করছে। সাঘাটায় শহীদদের স্মরণে একটি আধুনিক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রস্তাবও আলোচনায় উঠে আসে, যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে কাদের প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ নতুন করে শ্বাস নিচ্ছে।
আলোচনা সভার শেষ পর্যায়ে এক বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। সাঘাটার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও আলেমরা এই মোনাজাতে অংশ নেন। শহীদ আবু সাঈদ থেকে শুরু করে সাঘাটার যারা এই আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের সবার রূহের মাগফিরাত কামনা করা হয়। মোনাজাতের সময় অনেকের চোখেই জল দেখা যায়। উপস্থিত জনতা হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেন যেন বাংলাদেশ আর কখনও কোনো স্বৈরাচারের কবলে না পড়ে। সভার সমাপ্তি টেনে ইউএনও আশরাফুল কবীর বলেন, “শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে সাঘাটা উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। আমরা ইতিমধ্যে ৫ থেকে ১০টি স্পট চিহ্নিত করেছি যেখানে শহীদদের নামাঙ্কিত ফলক বসানো হবে।”
সভার বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই দিবসটি নিয়ে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। সাঘাটার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরাও এই আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছিল। তারা জানায়, পাঠ্যবইয়ে এই বীরত্বগাথা গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যাতে কেউ ইতিহাস ভুলে না যায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক তরুণ শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের দায়িত্ব এখন ৫% মেধা আর ৯৫% দেশপ্রেম নিয়ে দেশ গড়ার কাজে মন দেওয়া।” সাঘাটায় পালিত এই শহীদ দিবসটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল নতুন বাংলাদেশের প্রতি সাঘাটাবাসীর আনুগত্য ও ভালোবাসার এক প্রতিচ্ছবি। সন্ধ্যায় শহীদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
















