মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:
স্মৃতিতে অমলিন জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত দিনগুলো। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে ‘জুলাই শহীদ দিবস-২০২৬’ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কিংবদন্তি শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এক বিশাল র্যালি ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কোটচাঁদপুর উপজেলা শাখা এই কর্মসূচির আয়োজন করে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিকেল ঠিক ৫টায় পৌর শহরের প্রধান সড়কগুলোতে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। হাজারো নেতাকর্মীর অংশগ্রহণে এই দিনটি স্মরণীয় হয়ে ওঠে। কোটচাঁদপুরের আকাশ-বাতাস তখন শহীদদের স্মরণে দেওয়া স্লোগানে মুখরিত ছিল।
র্যালিটি কোটচাঁদপুরের বাইতুল মামুর জামে মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়। সেখান থেকে কয়েক হাজার মানুষের মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে। র্যালিতে অংশগ্রহণকারী কর্মীদের হাতে ছিল শহীদদের ছবি সম্বলিত ব্যানার ও পোস্টার। মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে ১০০% স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে র্যালিটি পুনরায় আগের স্থানে ফিরে আসে এবং সেখানে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ পথচারী ও ব্যবসায়ীরাও থমকে দাঁড়িয়ে এই আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হন। দুই বছর আগের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে করে অনেককেই আবেগপ্রবণ হতে দেখা যায়।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মাস্টার আজিজুর রহমান বলেন, “জুলাইয়ের শহীদরা আমাদের গর্ব। তারা যদি সেদিন রাজপথে বুক পেতে না দিত, তবে আজ আমরা মুক্ত বাতাসে কথা বলতে পারতাম না। বিশেষ করে শহীদ আবু সাঈদের সেই দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল গেঁথে থাকবে। সেই ত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। আমরা ১০০ ভাগ সংকল্পবদ্ধ যে, শহীদদের স্বপ্নের একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলবই।” তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিককে দল-মত নির্বিশেষে দেশের উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। বক্তারা উল্লেখ করেন যে, দেশে ৯৫% মানুষ এখন ন্যায়বিচার ও শান্তি চায়, যা শুধুমাত্র সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমেই সম্ভব।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং জুলাই বিপ্লবের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, জুলাইয়ের শহীদরা দেশের জন্য যে আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। জাতি তাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। এখন সময় এসেছে তাদের আদর্শকে বুকে ধারণ করার। দেশের প্রতিটি কোণায় ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গঠন করতে হবে। জামায়াত নেতারা দাবি করেন, গত ১৫ বছরের দুঃশাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে ছাত্র-জনতা যে রক্ত দিয়েছে, তার মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সমাবেশে বক্তারা দেশ গঠনে ইসলামি আদর্শের প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাস্টার শাহাবুদ্দিন খান এবং পৌর আমীর মুহাদ্দিস আব্দুল কাইয়ুম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মুয়াবিয়া হোসাইন, প্রভাষক শরিফুল ইসলাম, মাস্টার মশিয়ার রহমান, মাস্টার রেজাউল ইসলাম এবং শরিফুর রহমান খান টিটো। শাহ আলম, মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক, জাহিদ হোসেন আউয়াল ও মাহফুজুল হক মিন্টুসহ উপজেলা ও পৌর জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এই র্যালিতে নেতৃত্ব দেন। নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খল উপস্থিতি এবং শৃঙ্খলার মান ছিল প্রায় ১০০% নিখুঁত, যা সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
শহীদ আবু সাঈদ প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, আবু সাঈদ কোনো সাধারণ ছাত্র ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের একটি জলন্ত মূর্ত প্রতীক। তার দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে আজ পুরো কোটচাঁদপুর শোকাতুর। রংপুরের সেই মাটির সন্তান আজ সারা বাংলাদেশের মানুষের নয়নের মণি। তার শাহাদাতের পর থেকে এ দেশের তরুণদের মধ্যে যে দেশপ্রেম জাগ্রত হয়েছে, তা আগে কখনও দেখা যায়নি। আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে মাথানত না করে অধিকার আদায় করতে হয়। বক্তারা তার রুহের মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
র্যালি ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশের পর এক বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাতে শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই বিপ্লবে যারা শাহাদাতবরণ করেছেন, তাদের সবার আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। একইসঙ্গে দেশের সুখ, সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য কামনা করে প্রার্থনা করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করার সময় উপস্থিত অনেকের চোখেই জল দেখা যায়। কোটচাঁদপুর উপজেলার সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরাও দোয়ায় শরিক হন। এই কর্মসূচিটি কেবল রাজনৈতিক সমাবেশ ছিল না, বরং এটি ছিল শহীদদের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি মাধ্যম।
পরিশেষে, উপজেলা জামায়াতের নেতারা জানান যে, জুলাইয়ের শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে তারা বছরব্যাপী বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক কাজ চালিয়ে যাবেন। তারা বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য একটি সৎ নেতৃত্ব ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়া এখন সময়ের দাবি। আজকের এই র্যালি প্রমাণ করেছে যে, সাধারণ মানুষ আজও শহীদদের আত্মত্যাগ ভোলেনি এবং তারা একটি নতুন ও সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর। কোটচাঁদপুরের এই রাজপথ থেকে আজ সেই ঐক্যের ডাক সারা জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।
















