রাজাপুরে স্কুল কর্মচারীর ‘জাল টাকা’র কারবার: ভাইরাল অডিওতে তোলপাড়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email


ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার পালট গ্রাম এখন এক রহস্যময় অডিও রেকর্ড নিয়ে সরগরম। গত কয়েকদিন ধরে ফেসবুক খুললেই একটি কল রেকর্ড স্থানীয় মানুষের টাইমলাইনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। উপজেলার ৫১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বাদশা মিয়া হাওলাদারের একটি কথোপকথন ফাঁস হওয়ার পর থেকেই এলাকাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এই অডিওতে তাকে সরাসরি জাল টাকার ব্যবসার পরিকল্পনা এবং এর কৌশল নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। একজন সরকারি কর্মচারী হয়ে কীভাবে এমন ভয়ংকর অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার সাহস পেলেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখন ১০০% ক্ষোভ বিরাজ করছে।

ভাইরাল হওয়া অডিওটিতে দেখা যায়, বাদশা মিয়া ‘সৈকত’ নামের এক ব্যক্তির সাথে অত্যন্ত সাবলীলভাবে কথা বলছেন। তাদের কথোপকথনের ধরণ ছিল অনেকটা পেশাদার অপরাধীদের মতো। তিনি সৈকতকে জাল টাকার কারবার কীভাবে শুরু করতে হয় এবং এই ব্যবসায় নামলে কত দ্রুত লাভবান হওয়া যায়, তার নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। কথোপকথনটি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, রাজাপুরের অন্তত ৮০% স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর কাছে এটি এখন আলোচনার প্রধান বিষয়। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাটে-বাজারে সবখানেই এখন বাদশা মিয়ার এই ‘জাল টাকা’ মিশন নিয়ে সমালোচনা চলছে। সাধারণ মানুষ ভাবছে, একজন সামান্য কর্মচারী হয়ে তিনি যদি এমন বড় অপরাধের সাথে জড়িত থাকেন, তবে এর পেছনে নিশ্চয়ই আরও বড় কোনো শক্তিশালী চক্র রয়েছে।

বাদশা মিয়া উপজেলার বড়ইয়া ইউনিয়নের পালট এলাকার মৃত কাঞ্চন হাওলাদারের ছেলে। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাজ করছেন। তবে তার এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর। বাদশা মিয়ার এমন চাঞ্চল্যকর অডিও ফাঁসের পর থেকেই প্রশাসনের লোক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রায়ই বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছেন। স্কুলের ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীরা অপরিচিত মানুষ এবং পুলিশের আনাগোনা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন যে, বাদশা মিয়ার মতো একজন মানুষের পাশে তাদের সন্তানরা কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে তারা এখন ২০% থেকে ৩০% বেশি উদ্বিগ্ন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা এখন কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ঘটনার আর্থিক প্রভাব এবং সামাজিক ঝুঁকি অনেক গভীরে। বাংলাদেশে জাল টাকার বিস্তার রোধে সরকার সব সময় কঠোর অবস্থান নেয়। রাজাপুরের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, বাদশা মিয়ার মতো যারা নেপথ্যে কাজ করে, তারা ১,০০০ টাকার আসল নোটের বদলে ৪,০০০ বা ৫,০০০ টাকার জাল নোট সরবরাহের প্রলোভন দেখায়। যদি এই এলাকায় মাত্র ১০০টি ১,০০০ টাকার জাল নোটও ছড়িয়ে পড়ে, তবে সাধারণ দোকানদাররা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। সাধারণ মানুষের ধারণা, বাদশা মিয়ার এই আলাপের পেছনে অন্তত ৫,০০,০০০ থেকে ১০,০০,০০০ (৫ থেকে ১০ লাখ) টাকার জাল নোটের লেনদেনের পরিকল্পনা থাকতে পারে। এই অবৈধ কারবার দেশের অর্থনীতির জন্য যেমন হুমকি, তেমনি সাধারণ মানুষের কষ্টের উপার্জনকে মূল্যহীন করে দেয়।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত বাদশা মিয়া হাওলাদার। তিনি অদ্ভুত এক সাফাই গেয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “ভাইরাল হওয়া অডিওটি আমার, এটা সত্য। কিন্তু আমি কোনো অপরাধের সাথে জড়িত নই। আমার পরিবারকে এক বখাটে ছেলে অনেক দিন ধরে নানাভাবে বিরক্ত করছিল। তাকে উচিত শিক্ষা দিতে এবং কৌশলে আমার এলাকায় টেনে আনতে আমি জাল টাকার ব্যবসার মিথ্যা গল্প ফাঁদি। আমি স্রেফ তাকে ফাঁদে ফেলার জন্য এসব কথা বলেছি।” বাদশা মিয়ার এই দাবি অবশ্য স্থানীয়দের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। এলাকাবাসীর মতে, নিজের অপরাধ ঢাকতে তিনি এখন নতুন করে গল্পের জাল বুনছেন।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিউটি আক্তার এই ঘটনায় বেশ বিব্রত। তিনি জানান, একজন সহকর্মীর এমন নৈতিক অবক্ষয় পুরো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনাম নষ্ট করছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাদশা মিয়ার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের কারণে আমাদের স্কুলে এখন প্রায়ই মানুষকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে। এতে স্কুলের স্বাভাবিক পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি আমরা হালকাভাবে নিচ্ছি না। ইতিমধ্যেই আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে এবং আমরা তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছি।”

রাজাপুরের সচেতন মহল মনে করেন, বিষয়টি শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। পুলিশের উচিত দ্রুত এই অডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা করা এবং বাদশা মিয়ার সাথে আর কারা জড়িত আছে তা খুঁজে বের করা। যদি সত্যিই জাল টাকার কোনো বড় চক্র সেখানে কাজ করে, তবে তাদের এখনই গ্রেফতার করা জরুরি। তা না হলে রাজাপুরের বাজারগুলোতে জাল নোটের বন্যা বয়ে যেতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে। বাদশা মিয়ার মতো সরকারি কর্মচারীদের এমন কাণ্ড পুরো সরকারি সেবা খাতের ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। এখন দেখার বিষয়, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এই ‘জাল টাকা’ রহস্যের জট কত দ্রুত খুলতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ