বেলিংহাম জাদুতে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড: শুরুতে পিছিয়ে পড়েও নরওয়েকে হারাল থ্রি লায়ন্সরা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে আজ যখন রেফারির শেষ বাঁশি বাজল, তখন মাঠের একদিকে হাতাশায় মুখ ঢাকলেন আর্লিং হলান্ড, আর অন্যদিকে বুনো উল্লাসে মাতলেন জুড বেলিংহামরা। বিশ্বকাপের তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে এক শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। শুরুতে পিছিয়ে পড়েও মাঠ ছাড়েনি ইংল্যান্ড; বরং দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ গোলে নরওয়েকে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে ১৯৬৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই জয়ের ফলে ইংল্যান্ড চতুর্থবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ চারে পা রাখল। ম্যাচের নায়ক অন্য কেউ নন, রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ তুর্কি জুড বেলিংহাম। তাঁর জোড়া গোলেই মূলত নরওয়ের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে এবং ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালের পথ প্রশস্ত হয়েছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ছিল ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের পায়ে। টমাস টুখেলের শিষ্যরা মাঠের প্রায় ৬২% সময় বল নিজেদের অধীনে রেখেছিল। কিন্তু নরওয়ের জমাট রক্ষণভাগের সামনে থ্রি লায়ন্সদের আক্রমণগুলো বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছিল। উল্টো ম্যাচের ৩৬ মিনিটে পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেয় নরওয়ে। নিজেদের সীমানায় হ্যারি কেইনের পা থেকে কৌশলে বল কেড়ে নেন নরওয়েজিয়ান অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। তিনি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পাল্টা আক্রমণ সাজান এবং বল বাড়িয়ে দেন বাঁ দিকে থাকা আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপকে। শেলদেরুপের নিখুঁত শটটি ইংল্যান্ডের গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে পোস্টে লেগে জালে জড়ায়। ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে ইংল্যান্ডের ডাগআউটে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে।

নরওয়ের সামনে সুযোগ ছিল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেওয়ার। ম্যাচের ৪০ মিনিটে আরও একবার বিপদে পড়তে পারত ইংল্যান্ড। আলেক্সান্দার সরলথ বল নিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন, যেখানে তাঁর সামনে থাকা আর্লিং হলান্ড একদম ফাঁকায় ছিলেন। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে হলান্ডকে পাস দিলে গোল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ১০০%। কিন্তু সরলথ একাই গোল করার চেষ্টা করতে গিয়ে সুযোগটি নষ্ট করেন। আর ঠিক এই ভুলটিই কাল হয়ে দাঁড়ায় নরওয়ের জন্য। ফুটবল ইতিহাসে প্রচলিত আছে, সুযোগ নষ্ট করলে তার মাশুল দিতে হয়। নরওয়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বিরতির ঠিক আগে আগে সেই ভুলের শাস্তি দেয় ইংল্যান্ড।

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ইংল্যান্ডের হয়ে ত্রাতা হয়ে আসেন জুড বেলিংহাম। গর্ডনের বাড়ানো একটি চতুর পাস ধরে বেলিংহাম বক্সে ঢুকে পড়েন এবং ঠান্ডা মাথায় বাঁ পায়ের কোণাকুণি শটে গোল করে সমতা ফেরান। ১-১ সমতায় থেকে দুই দল বিরতিতে যায়। এই একটি গোল পুরো ইংল্যান্ড দলের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই ইংল্যান্ড আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মাঝমাঠে বেলিংহাম এবং রাইসের বোঝাপড়া নরওয়ের রক্ষণভাগকে তছনছ করে দিচ্ছিল। ম্যাচের ৬০ মিনিটের মাথায় বেলিংহাম নিজের এবং দলের দ্বিতীয় গোলটি করে ইংল্যান্ডকে লিড এনে দেন। ১টি সাধারণ আক্রমণ থেকে অসাধারণ ফিনিশিংয়ে বেলিংহাম বুঝিয়ে দেন কেন তাঁকে এই প্রজন্মের সেরা ফুটবলার বলা হচ্ছে।

ম্যাচের শেষ দিকে হ্যারি কেইন আরও একবার জালে বল পাঠিয়েছিলেন। গ্যালারিতে তখন সমর্থকরা উল্লাসে মাতলেও লাইন্সম্যান অফসাইডের পতাকা তোলায় সেই গোলটি বাতিল হয়ে যায়। তবে সেই আক্ষেপ বেশিক্ষণ থাকেনি। নরওয়ে তাদের শেষ চেষ্টা হিসেবে আর্লিং হলান্ডকে কেন্দ্র করে লং বল খেলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ আজ ছিল লৌহকঠিন। বিশেষ করে হ্যারি ম্যাগুইয়ার এবং জন স্টোনস মিলে হলান্ডকে কোনো স্পেস দেননি। ম্যাচের বাকি সময়টা ইংল্যান্ড পেশাদারিত্বের সাথে পার করে দেয় এবং ২-১ ব্যবধান ধরে রেখে মাঠ ছাড়ে। এই হারের মাধ্যমে নরওয়ের রূপকথার মতো পথচলা কোয়ার্টার ফাইনালেই থমকে গেল।

টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ডের এই জয়টি কৌশলগত দিক থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কঙ্গোর বিরুদ্ধে ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও তারা শুরুতে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়েছিল। সাধারণত বড় টুর্নামেন্টে শুরুতে গোল হজম করলে অনেক দল মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কিন্তু এই ইংল্যান্ড দল ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তারা স্নায়ুচাপ সামলাতে জানে। বেলিংহামের মতো তরুণ যখন দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন, তখন হ্যারি কেইন বা সাকার ওপর চাপ অনেক কমে যায়। আজকের ম্যাচে ইংল্যান্ডের পাসিং একুরেসি ছিল প্রায় ৮৮%, যা তাদের আধিপত্যের প্রমাণ দেয়। অন্যদিকে নরওয়ে কেবল পাল্টা আক্রমণের ওপর নির্ভর করে খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি।

এই জয়ের পর ইংল্যান্ডের সমর্থকরা এখন ফের ১৯৬৬ সালের পুনরাবৃত্তি দেখছেন। চতুর্থবারের মতো সেমিফাইনালে ওঠা নিশ্চিত করার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বইছে আনন্দের জোয়ার। বেলিংহামের জোড়া গোল তাঁকে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে। সামনের সেমিফাইনাল ম্যাচে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ কে হবে, তা নিয়ে এখন চলছে জল্পনা-কল্পনা। তবে কোচ টুখেল জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, ইংল্যান্ড তাদের স্বাভাবিক খেলাটাই খেলবে এবং বিশ্ব জয়ের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে না। আজকের ম্যাচটি কেবল একটি জয় নয়, এটি ছিল ইংল্যান্ডের চারিত্রিক দৃঢ়তার পরীক্ষা।

পরিশেষে বলা যায়, নরওয়ের বিপক্ষে এই জয়টি ইংল্যান্ডকে কেবল সেমিফাইনালই দেয়নি, বরং তাদের শিরোপা জয়ের অন্যতম দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জুড বেলিংহাম যেভাবে প্রতি ম্যাচে জ্বলে উঠছেন, তাতে প্রতিপক্ষ দলগুলো এখন থেকেই চিন্তায় পড়ে গেছে। নরওয়ের জন্য এটি একটি শিক্ষণীয় ম্যাচ ছিল, যেখানে বড় ম্যাচে সুযোগ হাতছাড়া করার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা তারা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। মায়ামির রাতটি আজ কেবল ইংল্যান্ডেরই ছিল। এখন দেখার বিষয়, সেমিফাইনালের বাধা টপকে বেলিংহামরা ফাইনালের মঞ্চে পৌঁছাতে পারেন কি না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ