বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে এবার যেন অন্য এক যুক্তরাষ্ট্রকে দেখছে ফুটবল বিশ্ব। গত ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ৪-১ গোলের বিশাল জয়ের পর এবার শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও নিজেদের দাপট বজায় রেখেছে তারা। কোচ মরিসিও পচেত্তিনোর অধীনে যুক্তরাষ্ট্র যেন এক অপ্রতিরোধ্য দলে পরিণত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শুরু থেকেই তারা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। চোটের কারণে দলের সবচেয়ে বড় তারকা ও অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচ এই ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার অনুপস্থিতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের ধার একটুও কমেনি। পচেত্তিনোর জাদুকরী কৌশলে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় জয়ে নকআউট পর্ব বা শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ম্যাচের শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণভাগে প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের এই আক্রমণাত্মক ফুটবলের ফলও আসে খুব দ্রুত। ম্যাচের মাত্র ১১ মিনিটেই তারা প্রথম গোলের দেখা পায়। বাঁ প্রান্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগান দারুণ একটি ক্রস বাড়িয়েছিলেন সতীর্থদের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ডিফেন্ডার ক্যামেরন বার্জেস মারাত্মক এক ভুল করে বসেন। বলটি তার পায়ে লেগে সরাসরি নিজেদের জালেই জড়িয়ে যায়। এই আত্মঘাতী গোলের ফলে শুরুতেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
প্রথম গোল পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র যেন আরও বেশি ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠে। পুরো প্রথমার্ধ জুড়ে তারা অস্ট্রেলিয়ার ওপর নিজেদের ১০০% আধিপত্য ধরে রাখে। বলের নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে পাসিং সব দিক থেকেই তারা অজিদের চেয়ে ঢের এগিয়ে ছিল। প্রথমার্ধের বিরতিতে যাওয়ার ঠিক আগে তারা দ্বিতীয় গোলটি আদায় করে নেয়। সের্হেনিও দেস্ত ডি-বক্সের বাইরে থেকে একটি দূরপাল্লার জোরালো শট নেন। বলটি অস্ট্রেলিয়ার এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বক্সের মধ্যে হঠাৎ করে অনেক ওপরে উঠে যায়। পরিস্থিতি দ্রুত বুঝে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্ডার অ্যালেক্স ফ্রিম্যান দারুণ এক হেডে বলটি সোজা জালে পাঠিয়ে দেন।
তবে এই গোলের পর কিছুটা নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। শুরুতে লাইন্সম্যান অফসাইডের পতাকা তুললে রেফারি গোলটি বাতিল করে দেন। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির যুগে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত টিকে থাকার সুযোগ নেই। রেফারি ভিএআর (VAR) বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির সাহায্য নেন। ভিএআর পর্যালোচনার পর দেখা যায় ফ্রিম্যান কোনোভাবেই অফসাইডে ছিলেন না। এরপর রেফারি নিজের সিদ্ধান্ত বদলে গোলটি বৈধ বলে ঘোষণা করেন। এটি ছিল বিশ্বকাপের মতো বিশাল মঞ্চে তরুণ ডিফেন্ডার ফ্রিম্যানের ক্যারিয়ারের প্রথম গোল, তাই তার উদ্যাপনও ছিল বাঁধভাঙা।
প্রথমার্ধে এমন দুর্দান্ত ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার পর দ্বিতীয়ার্ধে কোচ পচেত্তিনো দলের কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন আনেন। তিনি খেলোয়াড়দের কিছুটা হিসাবি হয়ে খেলার নির্দেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্র এই অর্ধে নতুন করে গোলের জন্য মরিয়া না হয়ে নিজেদের দুই গোলের মূল্যবান ব্যবধান ধরে রাখার দিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। তারা নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট পাস খেলে বলের প্রায় ৬০% নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখে। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি পাল্টা আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্রের জমাট রক্ষণভাগ ভাঙার মতো বড় কোনো সুযোগই তৈরি করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের পরিষ্কার জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের ভক্তদের জন্য এই জয়ের পাশাপাশি আরেকটি স্বস্তির খবরও আছে। দলের সবচেয়ে বড় তারকা ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচের চোট নিয়ে তারা বেশ চিন্তায় ছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তার বাঁ পায়ের কাফের চোটের বেশ দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। মেডিকেল টিমের মতে, তিনি হয়তো নকআউট পর্বের আগেই পুরোপুরি ফিট হয়ে উঠবেন। তবে কোচ পচেত্তিনো বা মেডিকেল টিম পুলিসিচকে মাঠে নামানো নিয়ে কোনো তাড়াহুড়া করতে চান না। তাকে ১০০% সুস্থ করেই তারা মাঠে নামাতে চান, কারণ নকআউট পর্বের ম্যাচগুলো হবে আরও অনেক বেশি কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
কোচ পচেত্তিনোর অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের এই দুর্দান্ত শুরু আগামী নকআউট পর্বে তাদের নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে ‘ডি’ গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্র ২ ম্যাচ খেলে ২টিতেই জিতে পূর্ণ ৬ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের একেবারে শীর্ষে অবস্থান করছে। অন্যদিকে সমান ২ ম্যাচ খেলে মাত্র ২ পয়েন্ট নিয়ে অস্ট্রেলিয়া আছে দ্বিতীয় স্থানে। এই গ্রুপের অন্য দুই দল তুরস্ক ও প্যারাগুয়ে একটি করে ম্যাচ খেললেও তারা এখনো কোনো পয়েন্টের দেখা পায়নি। এই গ্রুপে আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নকআউট পর্ব নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় তারা এখন পরের রাউন্ডের জন্য নিজেদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করার সুযোগ পাবে।
















