দেশের লাখ লাখ মধ্যবিত্ত পরিবার এবং অবসরপ্রাপ্ত মানুষের জন্য একটি বড় দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে নতুন অর্থবছর। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর অগ্রিম করের হার এক লাফে দ্বিগুণ করেছে সরকার। এখন থেকে যেকোনো ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা তোলার সময় ১০% হারে অগ্রিম কর বা ট্যাক্স কেটে রাখা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত নতুন বাজেটের অর্থবিলে এই প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষরা এখন আগের চেয়ে অনেক কম মুনাফার টাকা হাতে পাবেন, যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির এই কঠিন সময়ে তাদের সংসারের ওপর বিশাল এক আর্থিক চাপ তৈরি করবে।
নতুন এই বাজেট ঘোষণার আগে নিয়ম ছিল, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর মাত্র ৫% হারে উৎসে কর কেটে রাখা হতো। এই ৫% করকেই চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে ধরা হতো, অর্থাৎ বছর শেষে আর কোনো হিসাবের ঝামেলা ছিল না। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে সেই চূড়ান্ত কর দায় ব্যবস্থাটি পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়েছে। এর বদলে করের হার বাড়িয়ে ১০% করা হয়েছে। এর মানে হলো, যাদের জমানো টাকা থেকে আসা মুনাফাই সংসারের একমাত্র ভরসা, তাদের আয় এখন এক ধাক্কায় বেশ অনেকটা কমে যাবে।
একটি সহজ হিসাব দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যায়। বর্তমানে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত পরিবার সঞ্চয়পত্রের ওপর মুনাফার হার হলো ১১.৯৩%। এই হিসাবে প্রতি এক লাখ টাকার বিনিয়োগের জন্য একজন গ্রাহক মাসে ৯৯৪ টাকা ১৭ পয়সা মুনাফা পান। আগে ৫% কর কাটার পর গ্রাহক হাতে পেতেন ৯৪৫ টাকা। কিন্তু নতুন নিয়মে কর ১০% হয়ে যাওয়ায় গ্রাহক এখন হাতে পাবেন মাত্র ৮৯৫ টাকার মতো। অর্থাৎ প্রতি লাখে মাসে প্রায় ৫০ টাকা আয় কমে যাবে। ধরুন, একজন বয়স্ক মানুষ ১০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে রেখেছেন, নতুন নিয়মের কারণে মাসে তার অন্তত ৫০০ টাকা বা বছরে ৬,০০০ টাকা আয় কমে যাবে। বর্তমান বাজারে এই ৬,০০০ টাকার মূল্য অনেক।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি জানান, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর করের হার দ্বিগুণ হওয়ায় সবচেয়ে বড় বিপদে পড়বে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কারণ, দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশই সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা দিয়ে তাদের প্রতিদিনের সংসার, চিকিৎসা ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালান। এখন মুনাফা থেকে সরকার আগের চেয়ে বেশি টাকা কেটে নিলে এই মানুষগুলোর জীবনযাত্রার মান অনেক নিচে নেমে যাবে। তাই মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে একটু স্বস্তি দিতে সরকারের উচিত এই বাড়তি অগ্রিম করের নিয়মটি বাতিল করা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, অর্থবিল ২০২৬-এর মাধ্যমে ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ১৬৩ ধারা সংশোধন করে এই নতুন পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পর যদি দেখা যায় যে সঞ্চয়পত্র থেকে কেটে রাখা অগ্রিম করের পরিমাণ ওই ব্যক্তির মোট প্রদেয় আয়করের চেয়ে বেশি, তাহলে তিনি ওই অতিরিক্ত টাকা ফেরত পাবেন। এর জন্য তাকে নিজের ব্যাংক হিসাব নম্বর জানিয়ে এনবিআরে আবেদন করতে হবে। এরপর এনবিআর যাচাই-বাছাই করে ১২০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেবে।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগকারীর কোনো কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) নেই। তাদের এমন কোনো করযোগ্য আয়ও নেই যে তারা বছর শেষে রিটার্ন জমা দেবেন। এই জটিল আইনের কারণে সাধারণ মানুষ তাদের কেটে নেওয়া বাড়তি টাকা আর কখনোই ফেরত পাবেন না। ফলে তাদের কাছ থেকে আগের চেয়ে আরও বেশি টাকা শুধু অগ্রিম কর হিসেবেই কেটে নেওয়া হবে, যা এক প্রকার জুলুমের মতোই।
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু আছে। এগুলো হলো—পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। মেয়াদপূর্তি সাপেক্ষে এসব সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১.৭৭% থেকে ১১.৯৮% পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জমান মজুমদার দাবি করেছেন, ‘এবারের বাজেটে সঞ্চয়পত্র নিয়ে নতুন কিছু করা হয়নি।’ সরকারের এই কথার সঙ্গে বাস্তব কাজের কোনো মিল না থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরম হতাশায় ভুগছেন।
















