সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড় সুখবর: ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে আসছে নবম পে স্কেল

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের লাখ লাখ সরকারি কর্মচারীর দীর্ঘ এক যুগের অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। অবশেষে নতুন বেতনকাঠামো বা নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করার সময় তিনি এই আনন্দের খবরটি দেশবাসীকে জানান। আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই নতুন বেতনকাঠামো চালু করবে সরকার। দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি চাকুরিজীবীরা একই বেতনে কাজ করছেন। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কয়েক গুণ বাড়ায় তাদের সংসার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী নিজেও বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, বাজারে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। তাই সরকার কর্মচারীদের কষ্ট লাঘব করতে এই নতুন পে স্কেল দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নতুন এই বেতনকাঠামোতে কর্মচারীদের বেতন বেশ আকর্ষণীয় হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। অষ্টম পে স্কেল অনুযায়ী বর্তমানে একজন সরকারি কর্মচারীর সর্বনিম্ন মূল বেতন হলো ৮ হাজার ২৫০ টাকা। আর সর্বোচ্চ বেতন নির্ধারিত আছে ৭৮ হাজার টাকা। কিন্তু নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন বেতন এক লাফে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ বেতন গিয়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ সর্বনিম্ন ধাপে বেতন প্রায় ১৪২% বৃদ্ধি পাচ্ছে। নবম বেতন কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান সুপারিশ জমা দেওয়ার সময় জানিয়েছিলেন, এই বিশাল অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করতে সরকারের বাড়তি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের হিসেবে এটি প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার ($) সমপরিমাণ একটি বিশাল অঙ্ক। এত বড় অর্থের জোগান দেওয়া সরকারের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ।

এই নতুন পে স্কেল কীভাবে এবং কবে থেকে চালু হবে, তা ঠিক করতে গত ২১ এপ্রিল একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের এই কমিটি পুরো বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা এবং বাজেটের আকারের কথা মাথায় রেখে তারা সরকারকে তিন ধাপে এই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পরামর্শ দেয়। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, আগামী অর্থবছর থেকেই এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তিন ধাপের প্রথম ধাপটি বাস্তবে রূপ পেতে যাচ্ছে। একবারে পুরো চাপ না নিয়ে ধাপে ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়ন করলে দেশের অর্থনীতিতেও কোনো বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে না।

তবে সংসদে বাজেট ঘোষণার পর অনেকেই একটি বিষয়ে বেশ দ্বিধায় পড়ে যান। নতুন পে স্কেলের জন্য বাজেটে টাকা কোথায় রাখা হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। কারণ প্রতি বছরের মতো এবারও বাজেটের ‘সংক্ষিপ্ত-সারে বিবরণী-২খ’ অংশে অফিসার ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতার হিসাব দেওয়া হয়েছে। এই অংশে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ থাকে। সেখানে আগামী অর্থবছরের জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে বাজেটের বিবরণী-৪ অংশেও পরিচালন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ দেওয়া থাকে। সেখানে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ দেখানো আছে ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ৮৪ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। উভয় হিসাবেই বরাদ্দের বৃদ্ধি খুব সামান্য। তাহলে অর্থমন্ত্রী যে আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেন, সেই বিশাল অঙ্কের টাকা কোথা থেকে আসবে?

সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের এই বিভ্রান্তি দূর করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, নতুন বেতনকাঠামোর মূল টাকা আসলে অন্য একটি খাতের ভেতরে কৌশলে রাখা হয়েছে। এটি মূলত লুকিয়ে আছে বাজেটের ‘সংক্ষিপ্ত-সারের বিবরণী ২ ক’-এর মধ্যে। এই অংশে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের সম্পদের ব্যবহার দেখানো থাকে। সেখানে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতের জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার। অথচ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। হিসাব করলে দেখা যায়, জনপ্রশাসন খাতে এক বছরেই বরাদ্দ বেড়েছে বিশাল ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা খুব সহজ ভাষায় বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তারা জোর দিয়ে বলেন, জনপ্রশাসন খাতে যে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সেখান থেকেই মূলত নতুন পে স্কেলের টাকা দেওয়া হবে। এই টাকার মধ্যে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরাসরি সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং অবসরপ্রাপ্ত বা পেনশনভোগী ব্যক্তিদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে ব্যয় করবে সরকার। এর ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির যে প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করে সাধারণ কর্মচারীরা একটু স্বস্তিতে বাঁচার সুযোগ পাবেন।

পরিবার নিয়ে তারা নতুন করে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারবেন। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং বয়স্ক পেনশনভোগীরা এই ঘোষণার পর বেশ আনন্দিত হয়েছেন। কারণ বাজারে ওষুধের দাম থেকে শুরু করে যাতায়াত খরচ সবকিছুই গত কয়েক বছরে আকাশছোঁয়া হয়েছে। সীমিত আয়ের এই মানুষগুলোর পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। এখন নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে তাদের জীবনে বড় ধরনের আর্থিক নিরাপত্তা ফিরে আসবে। অর্থমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী ঘোষণা তাই লাখ লাখ পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। সরকার এখন দ্রুত এই বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে ১ জুলাই থেকে তা কার্যকর করার সব প্রস্তুতি নিলেই কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ