ঝিনাইদহ শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যক্রম শুরু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অত্যন্ত শান্ত, স্নিগ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী জেলা শহর। নবগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই শহরের মানুষের জীবনযাত্রা বেশ ছিমছাম। কিন্তু এই সুন্দর শহরের একটি বড় এবং দীর্ঘদিনের অভিশাপের নাম হলো জলাবদ্ধতা। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে পানি জমে যায়। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে শহরের মানুষকে বছরের পর বছর ধরে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তবে অত্যন্ত আশার কথা হলো, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ঝিনাইদহ শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং সংস্কারের কাজ বেশ জোরেশোরে শুরু হয়েছে। শহরের সাধারণ মানুষ এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং তারা স্বপ্ন দেখছেন একটি সুন্দর, পরিষ্কার ও চিরতরে জলাবদ্ধতামুক্ত ঝিনাইদহ শহরের।

বর্ষা মৌসুম ও নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি

যাঁরা ঝিনাইদহ শহরে বসবাস করেন, তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন বর্ষা মৌসুম এলে কী চরম ভোগান্তি শুরু হয়। শহরের পায়রা চত্বর, পোস্ট অফিস মোড়, আরাপপুর, ব্যাপারীপাড়া, হামদহসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায়। ড্রেনের ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি রাস্তায় উঠে আসে, যা দিয়ে হাঁটাচলা করা সাধারণ মানুষের জন্য এক প্রকার দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, বয়স্ক মানুষ এবং খেটে খাওয়া রিকশা বা ভ্যানচালকদের কষ্টের কোনো সীমা থাকে না। অনেক সময় বাসাবাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও নোংরা পানি ঢুকে যায়, যার ফলে আর্থিকভাবেও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হন শহরের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। এছাড়া জমে থাকা এই নোংরা পানি থেকে ডেঙ্গুসহ নানা পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। বছরের পর বছর ধরে এই সীমাহীন ভোগান্তি যেন নগরবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ড্রেনের বেহাল দশা

ঝিনাইদহ শহরে জলাবদ্ধতার এই ভয়াবহ রূপ এক দিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। শহরের পরিধি ও জনসংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নতুন নতুন বহুতল ভবন, মার্কেট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই তুলনায় পানি নিষ্কাশনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত কোনো মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়নি। আগে যেসব ড্রেন ছিল, সেগুলো অনেক সরু এবং আজকের দিনের বিশাল জনসংখ্যার বর্জ্য ও পানি ধারণ করার মতো ক্ষমতা সেগুলোর নেই। তাছাড়া শহরের পানি গিয়ে যে নবগঙ্গা নদীতে পড়বে, সেই সংযোগ পথগুলোও অনেক জায়গায় মাটি ও ময়লা জমে বন্ধ বা সরু হয়ে গেছে। ড্রেনের এই বেহাল দশাই মূলত শহরবাসীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নতুন উদ্যোগ: আশার আলো দেখছেন শহরবাসী

দীর্ঘদিনের এই পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধানে অবশেষে ঝিনাইদহ পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেছে। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। শহরের বিভিন্ন অলিগলি ও প্রধান সড়কের পাশে ড্রেন পরিষ্কার, গভীর করা এবং নতুন করে প্রশস্ত ড্রেন নির্মাণের কাজ এরই মধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এই উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হওয়ার ফলে শহরের সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় ধরনের আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিন পর একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ায় নগরবাসী মনে করছেন, এবার হয়তো সত্যিই বৃষ্টির দিনে প্যান্ট গুটিয়ে কাদা-পানি মাড়িয়ে বাড়ি ফেরার দিন শেষ হতে চলেছে।

অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ

ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না, শহরের বিভিন্ন জায়গায় ড্রেনের ওপর যে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে, সেগুলো সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক জায়গায় দেখা যায়, ড্রেনের ওপর পাকা দোকান, সিঁড়ি বা বাড়ির সীমানাপ্রাচীর তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ড্রেন পরিষ্কার করার কোনো উপায় থাকে না এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমান উন্নয়ন কার্যক্রমে এই বিষয়টির ওপর প্রশাসনের বিশেষ জোর দেওয়া উচিত। প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ড্রেনগুলো দখলমুক্ত করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারলে খুব দ্রুতই শহরের জমা পানি নদীতে গিয়ে পড়তে পারবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতা ও নাগরিক সচেতনতা

শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকেজো হওয়ার পেছনে শুধু কর্তৃপক্ষের অবহেলাই দায়ী নয়, আমাদের সাধারণ নাগরিকদেরও অনেক দায় রয়েছে। আমরা অনেকেই আমাদের বাসা-বাড়ির ময়লা, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলে দিই। এসব পলিথিন ও প্লাস্টিক জমে ড্রেনের মুখ পুরোপুরি ব্লক হয়ে যায়। নতুন ড্রেন নির্মাণ হলেও আমরা যদি আমাদের এই বদভ্যাস পরিবর্তন না করি, তবে হাজার কোটি টাকার উন্নয়নও কোনো কাজে আসবে না। শহরকে নিজের বাড়ির মতো মনে করতে হবে। ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ড্রেন কোনো ডাস্টবিন নয়—এই সচেতনতা সবার মাঝে জাগ্রত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

কাজের মান তদারকি ও টেকসই সমাধান

যেহেতু একটি বড় প্রকল্পের মাধ্যমে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার কাজ চলছে, তাই এই কাজের মান ঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন নিম্নমানের রড-সিমেন্ট ব্যবহার করে বা দায়সারাভাবে কাজ শেষ না করে, সেদিকে পৌর কর্তৃপক্ষ ও সচেতন নাগরিকদের কড়া নজর রাখতে হবে। আমাদের এমন একটি ড্রেনেজ ব্যবস্থা দরকার, যা আগামী ৫০ বছরের শহরের চাপ সামলাতে পারবে। সামান্য বৃষ্টিতেই যেন ড্রেন ভেঙে না পড়ে বা ব্লক না হয়ে যায়, তার জন্য টেকসই ও বিজ্ঞানসম্মত প্রকৌশল ব্যবহার করতে হবে। কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলেই এই প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষ শতভাগ ভোগ করতে পারবে।

উপসংহার

জলাবদ্ধতা একটি শহরের সৌন্দর্য, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। ঝিনাইদহ শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে যে নতুন কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই উদ্যোগ সফল হলে শহরের মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও কষ্টের চিরস্থায়ী অবসান ঘটবে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞে শুধু প্রশাসন বা পৌরসভার ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। একটি পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শহর গড়ে তুলতে হলে সাধারণ নাগরিক এবং প্রশাসনকে হাতে হাত রেখে একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা সাধারণ নাগরিকরা যদি একটু সচেতন হই এবং কর্তৃপক্ষ যদি তাদের দায়িত্ব সততার সাথে পালন করে, তবে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—খুব শিগগিরই আমরা একটি জলাবদ্ধতামুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও স্বপ্নের ঝিনাইদহ শহর ফিরে পাব।


সম্পর্কিত নিবন্ধ