কুমিল্লার শশীদল রেলস্টেশনে সাংবাদিকদের ওপর চোরাকারবারিদের হামলা ও ছিনতাই

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল রেলস্টেশন দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় অবৈধ পণ্য ও মাদক পাচারের অন্যতম একটি বড় রুট হিসেবে পরিচিত। আর এই পাচারকারীদের অপকর্মের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে এবার চরম বিপদে পড়েছেন স্থানীয় দুই সাংবাদিক। চোরাকারবারিরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে মারধর করেছে এবং মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় ইতিমধ্যেই ব্রাহ্মণপাড়া থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা।

ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার, ১৯ মে রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে। ভুক্তভোগী দুই সাংবাদিক হলেন বুড়িচং প্রেস ক্লাবের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও দৈনিক কালের কণ্ঠের স্থানীয় প্রতিনিধি আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয় এবং প্রেস ক্লাবের প্রচার সম্পাদক ও দৈনিক কুমিল্লা প্রতিদিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মো. শরিফুল ইসলাম সুমন। তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে শশীদল রেলস্টেশনে গিয়েছিলেন।

লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামগামী ‘চট্টলা এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি শশীদল স্টেশনে থামলে চোরাকারবারিরা বিপুল পরিমাণ ভারতীয় অবৈধ মালামাল ও মাদক ট্রেনে ওঠানো শুরু করে। সাংবাদিক হৃদয় ও সুমন এই দৃশ্য তাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করার চেষ্টা করেন। ঠিক তখনই কবির হোসেন, পারুল আক্তার এবং রাসেল নামের স্থানীয় কয়েকজনের নেতৃত্বে ১২-১৪ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। সাংবাদিকরা কোনোমতে প্রাণ বাঁচাতে মোটরসাইকেলে করে স্টেশন এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্টেশনের বাইরে এই চক্রটি তাদের গতিরোধ করে এলোপাতাড়িভাবে মারধর করে। সংবাদ প্রকাশ করলে তাদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়। হামলায় আহত দুই সাংবাদিক বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

শশীদল রেলস্টেশনটি শশীদল বিজিবি (বিওপি) ক্যাম্প থেকে মাত্র ১০০ গজের মধ্যে অবস্থিত। এত কাছে বিজিবি ক্যাম্প থাকার পরও দীর্ঘদিন ধরে এই স্টেশন ব্যবহার করে কীভাবে ভারতীয় চোরাই পণ্য ও মাদক দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে চরম ক্ষোভ ও সন্দেহ রয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, কয়েকটি সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র স্থানীয় প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে রেখেছে। প্রতিদিন এখানে গড়ে প্রায় কয়েক লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ি, কসমেটিকস ও মাদক পাচার হয়।

স্থানীয়রা একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তারা জানান, যখনই কোনো ট্রেন স্টেশনে প্রবেশের সময় হয়, তখনই পুরো এলাকায় রহস্যজনকভাবে বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর অন্ধকারে চোরাকারবারিরা নির্বিঘ্নে তাদের অবৈধ মালামাল ট্রেনে তুলে দেয়। ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার পর আবার জাদুর মতো বিদ্যুৎ ফিরে আসে। এটা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং পাচারকারীদের সাথে বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো অসাধু চক্রের গভীর আঁতাতের ফল বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হাজী জসিম উদ্দিন নির্বাচিত হওয়ার পর মাদক ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি নিজে একাধিকবার সীমান্তে অভিযানও পরিচালনা করেছেন। কিন্তু তার এই কড়া বার্তার পরও শশীদল স্টেশনে চোরাই মালামাল পাচার এক দিনের জন্যও থামেনি। মাঝে মধ্যে প্রশাসনের লোক দেখানো অভিযানে দুই-একজন চুনোপুঁটি ধরা পড়লেও এর পেছনে থাকা প্রভাবশালী ‘রাঘববোয়াল’ ও রাজনৈতিক গডফাদাররা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। সামনে কোরবানির ঈদ থাকায় সীমান্তে এই চক্রটি এখন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

হামলার পর সাংবাদিকরা সরাসরি শশীদল বিওপির কমান্ডারের কাছে বিষয়টি জানাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা এক অবাক করা দৃশ্য দেখতে পান। তারা দেখেন, শশীদল ইউনিয়ন পরিষদের কাছে খোদ বিজিবি কমান্ডার ও কয়েকজন সদস্য হামলাকারী চক্রের লোকদের সাথে খোশগল্পে মেতে আছেন! সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মালামাল পাচারের বিষয়ে কমান্ডারের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে সরাসরি রাজি হননি।

এই ঘটনার পর স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে তারা দেশের প্রশাসন ও সাংবাদিক সমাজের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তবে সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় এমন ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষ বা সাংবাদিকরা কি আসলেই সঠিক বিচার পাবেন? নাকি ক্ষমতা ও টাকার জোরে পার পেয়ে যাবে অপরাধীরা?

সম্পর্কিত নিবন্ধ