শৈলকুপায় গ্রাম আদালত নিয়ে বড় কর্মশালা: অল্প খরচে দ্রুত বিচার পেতে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গ্রামের সাধারণ মানুষ ছোটখাটো বিবাদ নিয়ে শহরে গিয়ে কোর্টে মামলা করলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন। উকিলের ফি, যাতায়াতের খরচ আর বছরের পর বছর ঘোরার কারণে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে একেবারেই পঙ্গু হয়ে যায়। একটি সাধারণ মামলা চালাতে গিয়ে অনেক সময় নিরীহ মানুষদের লাখ টাকার বেশি খরচ হয়ে যায়। অথচ নিজেদের হাতের কাছেই ইউনিয়ন পরিষদে খুব অল্প খরচে বিচার পাওয়ার দারুণ এক ব্যবস্থা রয়েছে, যার নাম গ্রাম আদালত। গ্রামের মানুষকে এই গ্রাম আদালত সম্পর্কে জানাতে এবং তাদের আইনি অধিকার নিয়ে সচেতন করতে আজ বুধবার ঝিনাইদহের শৈলকুপায় এক বড় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ ২০ মে ২০২৬ তারিখ সকালে শৈলকুপা উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে এই চমৎকার আয়োজনের উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন। ‘গ্রাম আদালত সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের ভূমিকা’ শিরোনামে এই কর্মশালায় এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি বা এনজিও প্রতিনিধি, স্থানীয় সাংবাদিক এবং সমাজসেবীরা একসঙ্গে বসে গ্রাম আদালতের সুবিধাগুলো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় কীভাবে সহজে পৌঁছানো যায়, তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। সবার মূল লক্ষ্য ছিল একটিই—সাধারণ মানুষকে কোর্ট-কাচারির হয়রানি ও দালালদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি দেওয়া।

আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, আমরা চাই গ্রামের মানুষ যেন ছোটখাটো ঝগড়া নিয়ে থানায় বা আদালতে ভিড় না করেন। তারা নিজেদের ইউনিয়ন পরিষদে এসে খুব সহজে নিজেদের সমস্যা মেটাতে পারেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবাশীষ অধিকারী। তিনি জমিজমা সংক্রান্ত ছোটখাটো বিরোধ কীভাবে গ্রাম আদালতে দ্রুত সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লা বলেন, গ্রাম আদালত ঠিকমতো কাজ করলে থানার ওপর মামলার চাপ অন্তত ৪০% থেকে ৫০% কমে যাবে। এতে পুলিশ চুরি-ডাকাতি বা গুরুতর অপরাধ দমনে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।

কর্মশালায় বক্তারা বারবার মনে করিয়ে দেন, সাধারণ মানুষ এখনো গ্রাম আদালতের পুরো ক্ষমতা ও সুবিধা সম্পর্কে পরিষ্কার জানেন না। জমিজমা নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, ছোটখাটো চুরি বা পাওনা টাকা আদায়ের মতো সমস্যাগুলো গ্রাম আদালতে খুব সহজে মেটানো সম্ভব। এখানে কোনো উকিল ধরতে হয় না। সাধারণত মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকা ফি জমা দিয়ে যে কেউ এখানে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দুই পক্ষের কথা শুনে একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করেন। সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যেই এসব বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে যায়। এতে মানুষের টাকা ও সময় দুটোই বাঁচে।

উপস্থিত সাংবাদিক ও এনজিও কর্মীদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান বক্তারা। তারা বলেন, আপনারা সমাজের আয়না। গ্রামের হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে আপনারা সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন। আপনারা যদি তাদেরকে গ্রাম আদালতের কথা বুঝিয়ে বলেন, তাহলে তারা অনেক বেশি সাহস পাবে। বিশেষ করে গ্রামের অবহেলিত নারী ও দরিদ্র মানুষরা যাতে বিনা বাধায় আইনগত সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। সবাই মিলে কাজ করলে গ্রামীণ সমাজে ১০০% শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

এই জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম মূলত ‘বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (৩য় পর্যায়)’ প্রকল্পের একটি অংশ। স্থানীয় সরকার বিভাগের সরাসরি সহযোগিতায় এই প্রকল্প দেশজুড়ে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এই প্রকল্পে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। সারা দেশে গ্রাম আদালতকে আধুনিক ও কার্যকর করতে তারা কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) বিনিয়োগ করছে। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ যেন বিনা হয়রানিতে নিজেদের এলাকায় সঠিক বিচার পান এবং সমাজে বৈষম্য কমে আসে।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের সামনে গ্রাম আদালতের নিয়মকানুন, বিচারপ্রক্রিয়া এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি চমৎকার প্রেজেন্টেশন তুলে ধরেন গ্রাম আদালতের উপজেলা কো-অর্ডিনেটর মতিয়ার রহমান। তিনি পর্দার মাধ্যমে ধাপে ধাপে দেখিয়ে দেন কীভাবে একজন ভুক্তভোগী খুব সহজেই গ্রাম আদালতে আবেদন করতে পারেন এবং কীভাবে নিরপেক্ষ বিচার প্যানেল গঠন করা হয়। তার এই প্রাণবন্ত উপস্থাপন উপস্থিত সবার কাছে বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করে তোলে। পুরো অনুষ্ঠানটি খুব সাবলীল ও সুন্দরভাবে সঞ্চালনা করেন শ্যামল বৈদ্য।

আয়োজকরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, আজকের এই কর্মশালার বার্তাগুলো উপস্থিত প্রতিনিধিরা নিজেদের এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন। সাধারণ মানুষ যখন জানবে যে বাড়ির কাছেই বিনা খরচে সঠিক বিচার পাওয়া যায়, তখন তারা আর শহরের কোর্ট-কাচারিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হবেন না। মানুষ সচেতন হলে গ্রাম আদালত আরও শক্তিশালী হবে এবং গ্রামীণ সমাজে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় থাকবে। আগামী দিনগুলোতে এমন কর্মশালা আরও বড় পরিসরে গ্রামের ভেতরে গিয়ে আয়োজন করার প্রত্যাশা নিয়ে আজকের এই সভার সমাপ্তি ঘটে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ