ব্রাহ্মণপাড়ার কৃতি সন্তান অধ্যাপক ড. একরামুল হক বুয়েটের নতুন উপাচার্য

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের সর্বোচ্চ প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার কৃতি সন্তান অধ্যাপক ড. একরামুল হক। গত বৃহস্পতিবার, ১৪ মে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার তাকে এই পদে নিয়োগ দেয়। এরপর শুক্রবার, ১৫ মে দুপুরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বুয়েটের ১৬তম উপাচার্য হিসেবে নিজের নতুন দায়িত্ব বুঝে নেন। আগামী ৪ বছরের জন্য তিনি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করবেন। দেশের সেরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে তার এই নিয়োগের খবরে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলাসহ পুরো কুমিল্লা জুড়ে ব্যাপক আনন্দের বন্যা বইছে। স্থানীয় মানুষেরা তাদের এই কৃতি সন্তানের জন্য অনেক বেশি গর্ববোধ করছেন।

বুয়েট বাংলাদেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর দেশের হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী এখানে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে কঠিন ভর্তি পরীক্ষায় বসে। কিন্তু তুমুল প্রতিযোগিতার কারণে শেষ পর্যন্ত ভর্তির সুযোগ পায় মাত্র ১% শিক্ষার্থী। এমন একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়া একজন শিক্ষাবিদের জন্য অত্যন্ত সম্মান ও বিশাল দায়িত্বের ব্যাপার। বুয়েটের উপাচার্য হিসেবে তিনি শুধু প্রশাসনিক কাজই পরিচালনা করবেন না, বরং দেশের বড় বড় প্রকৌশল ও গবেষণা প্রকল্পের দিকনির্দেশনাও দেবেন। উল্লেখ্য, বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি) দেশের বড় বড় মেগা প্রকল্পে সরকারকে কারিগরি পরামর্শ দিয়ে থাকে। এসব বিশাল প্রকল্পের আর্থিক মূল্য অনেক সময় কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) ছাড়িয়ে যায়। ড. একরামুল হক নিজে সম্প্রতি এই বিআরটিসির পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সাথে কাজ করে আসছিলেন।

অধ্যাপক ড. একরামুল হকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহালক্ষীপাড়া গ্রামে। তার বাবা মরহুম অ্যাডভোকেট ফজলুল হক মোল্লা এলাকার একজন অত্যন্ত সম্মানিত ও পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। ড. একরামুল হক ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। তিনি ১৯৮১ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সম্মিলিত মেধাতালিকায় ১৭তম স্থান অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৩ সালে ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি সম্মিলিত মেধাতালিকায় চমৎকারভাবে ৫ম স্থান অধিকার করেন। ছাত্রজীবনের এই ধারাবাহিক ও অভাবনীয় সাফল্য তাকে দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানে পড়ার পথ তৈরি করে দেয়।

এইচএসসি পাসের পর তিনি নিজের স্বপ্নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুয়েটের পুরকৌশল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগে ভর্তি হন। সেখানেও তিনি নিজের মেধার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৮৯ সালে তিনি পুরকৌশল বিভাগ থেকে অত্যন্ত সফলতার সাথে বিএসসি ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পুরো ব্যাচের মধ্যে মেধাতালিকায় ৩য় স্থান অধিকার করেন। পাস করার পরপরই একই বছর তিনি বুয়েটে নিজের বিভাগে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। তখন থেকেই তিনি দেশের নতুন প্রজন্মের প্রকৌশলীদের গড়ে তোলার এক মহান ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এই চিরচেনা ক্যাম্পাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন শিক্ষক।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নিজের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায়ও প্রচুর সময় ও শ্রম দিয়েছেন। তিনি ১৯৯৬ সালে জাপানের বিখ্যাত টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলভাবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন নামকরা জার্নালে তার ৫০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। দেশে ও বিদেশে তার এই গবেষণাগুলো দারুণভাবে সমাদৃত। কর্মজীবনে তিনি ১৯৯২ সালে বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক এবং ১৯৯৭ সালে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এরপর ২০০৫ সালে তিনি পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হন। নিজের কাজের স্বীকৃতি ও মেধার জোরে ২০১৭ সাল থেকে তিনি গ্রেড-১ অধ্যাপক হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

ড. একরামুল হক তার সুদীর্ঘ কর্মজীবনে বুয়েটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সব সময় তার শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন গবেষণায় উৎসাহ দিয়ে থাকেন। দেশের শিক্ষাবিদ ও সাধারণ প্রকৌশলীরা আশা করছেন, তার মতো একজন প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী ও গবেষণাভিত্তিক মানুষের নেতৃত্বে বুয়েট আগামী দিনে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। বিশেষ করে প্রযুক্তি উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ চুক্তি এবং বিশ্বমানের গবেষণার ক্ষেত্রে বুয়েটে নতুন মাত্রা যোগ হবে। সবাই গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বুয়েট দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা থেকে অত্যাধুনিক গবেষণার জন্য বিশাল অঙ্কের তহবিল বা ফান্ড নিয়ে আসতে সক্ষম হবে।

নতুন উপাচার্যের সামনে এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, যানজট নিরসন এবং পরিবেশ রক্ষায় বুয়েট সবসময় সরকারকে কারিগরি সহায়তা দেয়। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বুয়েট বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে আরও ওপরের দিকে উঠবে, এটাই এখন পুরো জাতির প্রত্যাশা। কুমিল্লার এই সাধারণ পরিবারের কৃতি সন্তান আজ শুধু নিজের এলাকার নয়, পুরো দেশের জন্য এক বিশাল গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। আগামী চার বছর তিনি তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সততা ও একাগ্রতার সাথে এই মহান দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

সম্পর্কিত নিবন্ধ