দেশের চিকিৎসা শিক্ষার প্রসার এবং স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত করতে সরকার অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এই নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের ফলে সারা দেশে বর্তমানে সরকারি মেডিকেল কলেজের মোট সংখ্যা বেড়ে ঠিক ৩৮-এ দাঁড়াল। উত্তরের অবহেলিত ও সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের লাখ লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন অবশেষে বাস্তবে রূপ নিল। এই আনন্দের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো ঠাকুরগাঁও জেলা এবং এর আশপাশের অঞ্চলে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এক দারুণ উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে এমন একটি বড় প্রতিষ্ঠানের অভাব তীব্রভাবে বোধ করছিলেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এই খুশির খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের মানুষকে নিশ্চিত করেছে। প্রজ্ঞাপনে তারা সরাসরি উল্লেখ করেছে, ঠাকুরগাঁও জেলায় ‘ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজ’ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার সরকারি মঞ্জুরি জ্ঞাপন করল। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এই নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও ওই প্রজ্ঞাপনে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে। সরকারের এই চূড়ান্ত আদেশের পর এখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্রুত মেডিকেল কলেজের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ, নকশা প্রণয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং অন্যান্য দাপ্তরিক কাজ শুরু করার জন্য জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ গড়ে তুলতে অনেকগুলো ধাপ পার হতে হয়, আর সরকার এখন সেই ধাপগুলো দ্রুত শেষ করতে চায়।
আমাদের দেশে চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করাটা দিন দিন বেশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। বর্তমানে দেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে একজন শিক্ষার্থীকে পাঁচ বছরের এমবিবিএস কোর্স শেষ করতে ৩০,০০০
থেকেশুরুকরে৪০,০০০
(ডলার) বা তারও বেশি অর্থ খরচ করতে হয়। এত বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করা মধ্যবিত্ত ও গরিব পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য একেবারেই অসম্ভব একটি কাজ। তাই ঠাকুরগাঁওয়ে এই নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ চালু হলে উত্তরের জনপদের অনেক সাধারণ পরিবারের মেধাবী ছেলেমেয়ে নামমাত্র খরচে ডাক্তার হওয়ার সুযোগ পাবেন। মেধাবী শিক্ষার্থীরা শুধু টাকার অভাবে আর ডাক্তারি পড়া থেকে বঞ্চিত হবেন না। এটি দেশের স্বাস্থ্য খাতে নতুন প্রজন্মের মেধাবীদের যুক্ত করতে বিশাল অবদান রাখবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশে যে পরিমাণ চিকিৎসক থাকা প্রয়োজন, আমাদের দেশে এখনো তার ঘাটতি রয়েছে। এই নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন চিকিৎসক তৈরি করে সেই ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করবে। শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাই নন, এই নতুন মেডিকেল কলেজের মাধ্যমে পুরো উত্তরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ সরাসরি দারুণভাবে উপকৃত হবেন। বর্তমানে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও এর আশপাশের এলাকার মানুষকে উন্নত বা জটিল চিকিৎসার জন্য প্রায়ই রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা খোদ রাজধানী ঢাকায় ছুটতে হয়। এতে মুমূর্ষু রোগীদের যেমন শারীরিক কষ্ট বাড়ে, তেমনি যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার পেছনে তাদের অনেক টাকা নষ্ট হয়। অনেক সময় পথের দূরত্ব বেশি হওয়ায় রোগীকে বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
একটি নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করার মানেই হলো সেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ একটি বড় হাসপাতাল তৈরি করা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অন্তত ৫০০ শয্যার এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি যখন পুরোদমে চালু হবে, তখন ওই বিশাল এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান অন্তত ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। মানুষ তখন খুব সহজে ঘরের কাছেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাবেন। যেকোনো বড় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হলে ওই এলাকার অর্থনীতিতেও এর একটি বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। সরকার একটি নতুন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ করতে সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার ($) বা কয়েক শ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করে। এই বিশাল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে ঠাকুরগাঁও এলাকায় অনেক মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
এই মেডিকেল কলেজকে কেন্দ্র করে এর চারপাশের এলাকায় নতুন ফার্মেসি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক, ছাত্রাবাস, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুব দ্রুত গড়ে উঠবে। এতে স্থানীয় মানুষের আয় অনেক বাড়বে এবং এলাকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন খুব দ্রুত ত্বরান্বিত হবে। ঠাকুরগাঁওয়ের সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন অনেক বছর ধরেই নিজেদের জেলায় একটি মেডিকেল কলেজের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বিভিন্ন সময় তারা দাবি আদায়ে রাজপথে মানববন্ধন, সভা ও সমাবেশ করে সরকারের কাছে নিজেদের এই যৌক্তিক দাবি তুলে ধরেন। সরকার তাদের সেই দাবি মেনে নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের নেতারা সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানিয়েছেন।
তারা মনে করেন, সরকার অত্যন্ত সঠিক সময়ে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদের একটাই চাওয়া, সরকার যেন কোনো ধরনের কালক্ষেপণ না করে খুব দ্রুত মেডিকেল কলেজের ভবন নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের কাজ শেষ করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা অত্যন্ত দ্রুত এই মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করার জন্য নিরলস কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সব প্রক্রিয়া ঠিকমতো এগোলে হয়তো আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই কলেজে প্রথম ব্যাচের এমবিবিএস শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। শুরুতে হয়তো কোনো অস্থায়ী ভবনে ক্লাস শুরু হবে এবং পরে মূল ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ শেষ হলে সেখানে কার্যক্রম স্থানান্তর করা হবে। নতুন এই মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে বের হওয়া তরুণ চিকিৎসকরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অনেক বিরাট ভূমিকা রাখবেন।
















