জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক চুক্তি সই

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের জ্বালানি খাতের চরম সংকট মেটাতে এবং আগামী দিনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক বিশাল ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ সই করেছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকালে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সম্পন্ন হয়। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সই করেন তাদের বর্তমান জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। অন্যদিকে বাংলাদেশের হয়ে অত্যন্ত গর্বের সাথে স্বাক্ষর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ওয়াশিংটনে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস এক বিস্তারিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষকে এই খুশির খবর জানিয়েছে। এই চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও অনেক বেশি গভীর ও মজবুত হবে বলে সবাই প্রবলভাবে আশা করছেন।

বর্তমানে পুরো বিশ্ব এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায়ই ওঠানামা করছে। অনেক সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। কারণ আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানির বিশাল একটি অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করি। এমন পরিস্থিতিতে শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা দেশের ওপর নির্ভর করে থাকাটা আমাদের অর্থনীতির জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তাই মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প এবং নির্ভরযোগ্য উৎস খোঁজার যে তাগিদ বাংলাদেশের ছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে তা অনেকটাই পূরণ হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ দূতাবাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আমরা এখন দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি পাওয়ার চমৎকার একটি নিশ্চয়তা পেলাম। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে এবং শিল্পকারখানাগুলো পুরোদমে চালু রাখতে আমাদের প্রচুর পরিমাণ এলএনজি ও এলপিজি প্রয়োজন হয়। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক খোলা বাজার থেকে এসব জ্বালানি কিনতে গিয়ে আমাদের প্রায় ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার ($) খরচ করতে হয়। অনেক সময় চড়া দামের কারণে আমাদের অর্থনীতিকে বেশ হিমশিম খেতে হয়। কিন্তু এখন এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি এবং তুলনামূলক অনেক কম দামে এলএনজি, এলপিজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি পণ্য দেশে আনা সম্ভব হবে। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি থাকবে না এবং দেশের সাধারণ মানুষের ওপর জিনিসপত্রের দাম বাড়ার চাপও বেশ কিছুটা কমবে।

শুধু তেল বা গ্যাস কেনা-বেচার মধ্যেই এই চুক্তি সীমাবদ্ধ থাকছে না। দুই দেশ মিলে প্রযুক্তি ও গবেষণার ক্ষেত্রেও একযোগে কাজ করবে। তেল, গ্যাস, ভূতাপীয় এবং জৈবশক্তির মতো বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিশ্বের সবার চেয়ে এগিয়ে। এই চুক্তির ফলে তারা তাদের সেই জ্ঞান ও দক্ষতা আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞদের সাথে ভাগ করে নেবে। এর মাধ্যমে আমাদের দেশের প্রকৌশলী ও কর্মীদের কাজের সক্ষমতা অন্তত ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। দেশে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং সেগুলো থেকে আধুনিক উপায়ে গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তি আমাদের বিশালভাবে সাহায্য করবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জৈবশক্তি নিয়ে গবেষণার নতুন দরজাও খুলে যাবে।

বৃহস্পতিবারের এই চুক্তি সই অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত আনন্দঘন। সেখানে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এই চুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বের যে নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে, এটি তারই একটি চমৎকার উদাহরণ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই যুগান্তকারী উদ্যোগে সার্বিক সমর্থন দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটও দারুণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি এই সমঝোতা স্মারককে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে এই চুক্তির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দেশে যদি গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাব থাকে, তবে আমাদের পোশাক কারখানা থেকে শুরু করে ছোট-বড় সব ধরনের শিল্পকারখানা চরম ক্ষতির মুখে পড়ে। কারখানার চাকা ঠিকমতো ঘুরলে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং মানুষের পেটে ভাত জোটে। আমাদের তৈরি পোশাক খাত থেকে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ($) বেশি আয় আসে, যা পুরোপুরি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যদি আমরা নিয়মিত ও সাশ্রয়ী দামে গ্যাস আনতে পারি, তবে কারখানার উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাবে। এছাড়া বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের সংকট এবং লোডশেডিংয়ের মতো চরম বিরক্তিকর সমস্যা থেকে সাধারণ মানুষ মুক্তি পাবে। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও বেগবান হবে।

এই ধরনের একটি বড় চুক্তি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন বিশ্ব কূটনীতিতে অনেক বেশি দূরদর্শিতা ও পরিপক্বতা দেখাচ্ছে। জ্বালানির মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়ের জন্য শুধু একটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল না থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তির সাথে এমন কৌশলগত চুক্তি করা সত্যিই একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দেশের সাধারণ মানুষ, অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কবে এই চুক্তির বাস্তব সুফল দেশের মাটিতে এসে পৌঁছাবে। চুক্তিটি যদি দ্রুত ও ঠিকঠাকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের জন্য বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আর কোনো বড় ধরনের দুশ্চিন্তা থাকবে না। তখন দেশের অর্থনীতিও কোনো বাধা ছাড়া খুব দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ